Logo

রাজনীতি

আমেরিকার সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি : সিপিবি

Icon

বাংলাদেশের প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩০

আমেরিকার সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি : সিপিবি

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা মহানগর উত্তরের উদ্যোগে ‘আমেরিকার সাথে অসম বাণিজ্য চুক্তি : বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) বিকাল ৩টায় সেগুনবাগিচায় অবস্থিত রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর–রুনি মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক কমরেড লূনা নূরের পরিচালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম. এম. আকাশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন, সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং কলামিস্ট ও লেখক আবু তাহের খান।

সভায় মূখ্য আলোচক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একদিকে আমেরিকার প্রায় ১২০০ কোটি টাকা মওকুফ করা হয়েছে, অন্যদিকে ১৫ শতাংশের জায়গায় ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আগে যেখানে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা শুল্ক আদায়ের কথা ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। তিনি বলেন, চুক্তির ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় “shall” শব্দটি বাংলাদেশ অংশে ১৩১ বার ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মাত্র ৬ বার। এর মাধ্যমে চুক্তির অসমতা স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, এতে নন-ডিসক্লোজার ক্লজ রয়েছে এবং মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এসে চুক্তির ভাষা তৈরি করেছেন, যেখানে জবরদস্তিমূলক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টন পণ্য কিনতে হবে, ফলে বাংলাদেশ আর সস্তা উৎস থেকে পণ্য কিনতে পারবে না। সরকার ভর্তুকিও দিতে পারবে না। ডিফেন্স প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কিনতে হবে এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না এবং চুক্তি ভঙ্গ করলে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।

অধ্যাপক এম. এম. আকাশ বলেন, চুক্তিটি অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে এবং এতে স্বচ্ছতা ছিল না। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় মাত্র তিন–চারজন মানুষ যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং নিজেদের পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা। তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের একটি বড় বাজার তারা পেয়ে গেছে, যেখানে তুলা, প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য বিক্রি করবে, বাংলাদেশকে বিমান কিনতে হবে এবং নিরাপত্তা জোটের অবস্থানও পরিবর্তন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আইসিটি ও রোবোটিকস খাতে উদ্ভাবন বাড়াতে হবে।

কলামিস্ট ও লেখক আবু তাহের খান বলেন, বিষয়টি নিয়ে দেশে তেমন কোনো বিস্তৃত আলোচনা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ৭৩৭৯টি পণ্যের রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও বাংলাদেশের এমন শক্তিশালী শিল্পভিত্তি নেই যাতে এত পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। অন্যদিকে ১০৩৯টি পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রই বেশি লাভবান হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, জি-টু-জি পদ্ধতিতে ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে এবং বোয়িং বিমান কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সরাসরি কেনার উদ্যোগ অন্যায্য। তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কিনতে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিতে হবে এবং এতে দেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এমন দেশবিরোধী চুক্তির নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত রাজপথেই করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের একটি ঘাঁটিতে পরিণত করতে চায়। তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবিলম্বে অব্যাহতি দিতে হবে এবং এই চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমান সময়ে সাম্রাজ্যবাদ নয়া উপনিবেশবাদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা চায় যেখানে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য দেশগুলোকে কার্যত নির্ভরশীল অবস্থায় থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, ব্রিকস জোট ও চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করার নৈতিক বা রাজনৈতিক এখতিয়ার নেই এবং সব চুক্তির বিস্তারিত জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

সিপিবি সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সম্পাদিত এই অসম বাণিজ্য চুক্তি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে। তিনি জনগণের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিল এবং জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

সভাপতি কমরেড হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল আলোচনা শেষে বলেন, আলোচকদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে চুক্তিটি অসম, অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি চুক্তি বাতিলের দাবিতে কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত থানায় থানায় পথসভা ও গণযোগাযোগ, ৮ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ৭ মে সমাবেশ করে জাতীয় সংসদের সকল সংসদ সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান (রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী ছাড়া)।

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সিপিবি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর