ছবি: সংগৃহীত
দলীয় এমপিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিতর্কে পড়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সরকারি অনুদান বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, সংসদে দলটির এমপিদের ওয়াশিং মেশিন কেনার দাবি এবং জীবিত পিতাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বক্তব্যে দলটির ভাবমূর্তি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে দলটির প্রতিপক্ষরা।
সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জামায়াতের ৬৮ জন এমপি হয়েছেন। এ ছাড়া দলটির ৯ জন সংরক্ষিত আসনে নারী এমপি রয়েছেন।
নির্বাচনের আগে ‘ইনসাফভিত্তিক’ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে মাঠে নেমেছিল দলটি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেয়ে সংসদের বিরোধী দল নির্বাচিত হয়েছে। আর এ কারণেই দলটির সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড অনেকে আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।
তবে, নির্বাচনের চার মাস না যেতেই দলটির বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় জামায়াতের নীতি-নির্ধারকরা বিব্রত। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দেশে জাতীয় অনেক ইস্যু এবং অনেকের বড় ধরনের অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও কয়েক হাজার টাকার অনুদান বা ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে এমপিদের বিরুদ্ধে যেভাবে সমালোচনা তৈরি হচ্ছে, তাতে রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষও সুযোগ পাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘এসব ঘটনা আর্থিকভাবে বড় কোনো দুর্নীতির চিত্র না হলেও রাজনৈতিকভাবে দলের জন্য অস্বস্তিকর। সুতরাং আমাদের এমপিদের আরো সতর্ক হওয়া উচিত। আমরা দলের এমপিদের সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছি।’
যেসব এমপি নানা কর্মকাণ্ডে আলোচিত-সমালোচিত সবশেষ সেই কাতারে যুক্ত হয়েছেন নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চু। তিনি ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদানের তালিকায় নিজে মেয়ের নাম থাকার ঘটনায় সমালোচনায় পড়েন। অনুমোদিত তালিকায় তার মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেখানো হয়।
একই তালিকায় অধিকাংশ সুবিধাভোগী তার নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ির এলাকার হওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে।
সমালোচনার মুখে এমপি আতাউর রহমান তালিকাটি সঠিক বলে স্বীকার করেন এবং দায় চাপান তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানের ওপর। তিনি পিএ আবু সালেহকে ২৮ জুন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ভাগনে, ভগ্নিপতি ও অন্যান্য আত্মীয়দের সভাপতি করার অভিযোগ সামনে আসে। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই বিষয়টি সামনে এসেছে। যা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া চলতি অধিবেশনে বেশ কয়েকটি দুটি ঘটনায় সমালোচিত হয়েছেন দুই সংসদ সদস্য। গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আবদুল মুনতাকিম নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ দাবি করেন।
কিন্তু তার নির্বাচনী হলফনামায় জন্ম সাল ১৯৮১ এবং বাবা-মা দুজনই জীবিত থাকার তথ্য সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে তিনি এটিকে ‘অসাবধানতাবশত মুখ ফসকে বলা’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সংসদের কার্যবিবরণী সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
১৭ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং পর্দা দেওয়ার দাবি তুলে সমালোচনার মুখে পড়েন। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের নানা সংকটের মধ্যে এ ধরনের দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া খুলনা-৬ আসনের এমপি আবুল কালাম আজাদের নামে বরাদ্দ হওয়া প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
কয়রা উপজেলার তালিকায় তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ভাগনে এবং একাধিক সচ্ছল ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সেখানে দলীয় নেতাকর্মীরা চার হাজার টাকা পেলেও সাধারণ উপকারভোগীদের দেওয়া হয় দুই হাজার টাকা করে।
১০ মে সাতক্ষীরার নতুন জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জামায়াতের তিন সংসদ সদস্য। তিনজন আইন প্রণেতা ডিসিকে এভাবে ফুল দিতে পারে কিনা তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
যদিও ওইসব এমপির দাবি ছিল, সিভিল সার্জন নতুন ডিসিকে ফুল দেওয়ার সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা ডিসিকে ফুল দেননি।
এর বাইরে কুষ্টিয়ার জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজাকে ঘিরেও নানা বিতর্ক রয়েছে। তিনি সংসদের নারী এমপিদেরকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার শিকার হন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে বক্তব্য দেওয়ায় মানহানির মামলাও তার বিরুদ্ধে সমন জারিও করা হয়।
কেন্দ্রের কড়া বার্তা: জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘জামায়াতের এমপিদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অন্য দলের তুলনায় বেশি। ছোট একটি ভুলও বড় বিতর্কে পরিণত হচ্ছে। অথচ অন্য দলের অনেকেই কোটি কোটি টাকার অনিয়ম করলেও সেটি সামনে আসছে না। তারপরও ভবিষ্যতে এমন কোনো কর্মকাণ্ড যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জামায়াতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা মনে করছেন, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিকভাবে এসব বিষয়কে বড় করে তুলে ধরছে। তবে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন হচ্ছে, সমালোচনার সুযোগ যেন কোনোভাবেই সৃষ্টি না হয়, সে দায়িত্বও এমপিদেরই নিতে হবে।
সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকারি অনুদান বণ্টনসহ সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

