Logo

রাজনীতি

রাষ্ট্রীয় ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে পরীক্ষিত নেতারা

ত্যাগীদের মূল্যায়নের পথে বিএনপি

নতুন চার মুখ স্থায়ী কমিটিতে

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২১:০২

ত্যাগীদের মূল্যায়নের পথে বিএনপি

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের পর বিএনপিতে শুরু হয়েছে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা। দলীয় রাজনীতির শীর্ষ পদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে জায়গা করে নিচ্ছেন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতারা।

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়নের উদ্যোগ, জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চার নেতার অন্তর্ভুক্তি এবং ১১টি সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগÑ সব মিলিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপির নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রফেসর আব্দুল লতিফ মাসুম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন করা বিএনপির সামনে ক্ষমতায় এসে দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের চাপ ছিল। সেই চাপ সামলাতে একদিকে পুরনো ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসন ও পেশাজীবী মহল থেকে অভিজ্ঞদেরও দলের নীতি-নির্ধারণী কাঠামোয় আনা হচ্ছে। 

মির্জা ফখরুলকে ঘিরে বড় রাজনৈতিক বার্তা: বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের উদ্যোগকে ত্যাগী নেতৃত্বের মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ১৬ বছর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব হন।

খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার সময়ে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক মামলায় একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।

তাকে রাষ্ট্রপতি পদে নেওয়া হলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে নতুন নেতৃত্ব আসার পথ তৈরি হবে। ফলে এটি শুধু একজন নেতার পদায়ন নয়, একই সঙ্গে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসেরও সূচনা হতে পারে।

স্থায়ী কমিটিতে ত্যাগের স্বীকৃতিতে চারজন: বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেনÑ রুহুল কবির রিজভী, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।

অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ও আমানুল্লাহ আমান বিএনপির রাজনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তবে স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়া সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে নিয়ে অনেকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান না থাকার পরও তারা কীভাবে স্থায়ী কমিটিতে স্থান করে নিলেন সেটা নিয়ে কারও কারও মনে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তবে বিএনপির সূত্র জানায়, প্রশাসন ও চিকিৎসা পেশায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই দুই নেতা বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত দীর্ঘদিন ধরে। তারা বিভিন্ন সময় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। 

নতুন চারজনের মধ্যে দুই নেতার অন্তর্ভুক্তি যেমন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগের স্বীকৃতি, তেমনি অন্য দুইজনের অন্তর্ভুক্তি বিএনপির নীতি-নির্ধারণে নতুন ধরনের দক্ষতা যুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও দলীয় নেতাদের জায়গা: দলীয় কাঠামোর বাইরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও বিএনপি নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। সর্বশেষ ২৩ জুলাই ১১টি সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন, বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা দায়িত্ব পেয়েছেন।

নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্পাদকীয় পর্যায়ের নেতা এবং যুব ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও রয়েছেন। একইভাবে জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, সরকার গঠনের পর বিএনপি শুধু দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বকেই নয়, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করছে।

অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, এই প্রক্রিয়া বিএনপির জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন আন্দোলন করা নেতাদের মূল্যায়ন রাজনৈতিকভাবে দলের অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়াতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের যোগ্যতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে এসব সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা।

সব মিলিয়ে, ক্ষমতায় এসে বিএনপি যে ধারাটি তৈরি করেছে, তাতে তিনটি বিষয় স্পষ্টÑত্যাগী নেতৃত্বের মূল্যায়ন, দলের নীতি-নির্ধারণী কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন