কয়েকটি কার্ড ছাড়া সরকার কিছুই দিতে পারেনি: জামায়াত আমির
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩১
# ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনছি, চোখ রাঙানিকে ভয় করি না
# গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে রাস্তায় নেমেছি
# সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে
# লংমার্চ সরকার পতনের আন্দোলন নয়: আবদুল্লাহ মো. তাহের
# লংমার্চে বাধা দিলে ৬ দফা হবে ১ দফা: নাহিদ ইসলাম
গত ৬ মাসে সরকার কয়েকটি কার্ড ছাড়া জনগণকে আর কিছুই দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে, প্রতারণা করছে। ওয়াদা দিয়ে তা লঙ্ঘন করছে। গণভোটের পক্ষে থেকে জনগণ থেকে ভোট আদায় করে এখন গণভোটের রায়ের বিরোধিতা করছে সরকার। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবেন।
শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পৌর সদরের উত্তর বাজার এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা রাস্তায় নেমেছি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করার জন্য। রাস্তায় নেমেছি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য। আমরা রাস্তায় নেমেছি আপনাদের ঘরে গ্যাস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। রাস্তায় নেমেছি আপনাদের ঘরে বিদ্যুৎ ও বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করার জন্য। ইনশাআল্লাহ, দাবি পূরণ করে ঘরে ফিরব।
ডা. শফিকুর রহমান জনগণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, আপনারা কি ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান, গ্যাস পান ? সীতাকুণ্ডে চাঁদাবাজি হয় কি না ? সীতাকুণ্ডে কি মাদক আছে ? সন্ত্রাস আছে ? তিনি বলেন, দেশ মাদকে ভরে গেছে। আমাদের যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজকে বাঁচান, দেশকে বাঁচান।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশাবাদী জনতার বিজয় হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা সব দাবি আদায় করব ইনশাআল্লাহ। জনতা আমাদের সাথে আছে, আমরা গন্তব্যে পৌঁছবো। পথ সভায় এনসিপির নেতৃবৃন্দসহ ১১ দলীয় ঐক্য’র বিভিন্নস্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। পথসভা শেষে হাজারো গাড়ীবহর নিয়ে চট্টগ্রামের লালদিঘির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন নেতৃবৃন্দরা।
এর আগে এদিন বিকালে ফেনীর মহিপালে আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পুরোনো ফ্যাসিবাদকে এ দেশ থেকে বিদায় করতে অনেক সংগ্রাম, লড়াই ও যুদ্ধ করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদ কীভাবে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হয় আমাদের জানা আছে।
বলেন, ‘আমরা রাস্তায় নেমেছি কোনো দলীয় দাবি বা কাউকে নেতা বানানোর জন্য নয়। নতুন করে আবার ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। পুরোনো ফ্যাসিবাদকে বিদায় করতে সাড়ে ১৫ বছর জনগণকে অনেক লড়াই, সংগ্রাম ও যুদ্ধ করতে হয়েছে। অনেক জীবন দিতে হয়েছে। এই সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের কম নয়। শুধু জুলাইতেই ১৪শর বেশি।’
‘এখন যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করবে, তাদের জন্য ওই সাড়ে ১৫ বছরের দরকার পড়বে না। এখানেই একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে চলেছি, আমাদের সব চেনা। কার কতটুকু বুকের পাটা, আমরা জানি’ যোগ করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে চোখ রাঙানোর সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের এখন চোখ রাঙানো হয়। এই চোখ রাঙানি কোথায় ছিল সাড়ে ১৫ বছর? সরকারের অনুমতি না নিয়ে ১০ জন মানুষ রাস্তায় নামার সাহস আপনারা করেননি। কোনো চোখ রাঙানিকে আমরা ভয় করি না, ভয় করি শুধু আল্লাহকে।’
জনগণের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশই আমাদের ঠিকানা। আমাদের ওপর স্টিম রোলার চালানো হয়েছে। কিন্তু আমরা দাদার বাড়ি, পিসির বাড়ি যাইনি। দেশ ছাড়িনি, মাটি কামড়ে এ দেশের বুকে ছিলাম। জনগণের সঙ্গে সুখে-দুঃখে ছিলাম। আমরা কথা দিচ্ছি, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে বজ্রপাতেও আপনাদের সঙ্গে থাকব।’
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশবাসী ভালো নেই। আজ ঢাকা থেকে পথে পথে দেখেছি বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ কোথায় আছে জানেন? বিদ্যুৎ আছে জাতীয় সংসদের ভেতরে, বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িঘরে। আবার জিজ্ঞেস করলে বলেন কোনো সংকট নেই। মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যারা মিথ্যা কথা বলতে পারে, তাদের দ্বারা দেশের মানুষের কোনো সমস্যা সমাধান হতে পারে না।’
জনগণের অধিকার নিয়ে টান দিলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আপনারা দেশ ধ্বংস করবেন, সব পর্যায়ে বেপরোয়া, নির্লজ্জ, বেহায়া দলীয়করণ করবেন আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে? জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাবেন, বিরোধী দল চুপ করে বসে থাকবে? বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে যেখানে জনগণের অধিকার নিয়ে টান দেওয়া হবে, সেখানেই বর্জন করা, বাধা দেওয়া, প্রতিবাদ করা এবং সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’
এর আগে লংমার্চে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা খানিকটা সময় দিচ্ছি। কিন্তু এ সময় দীর্ঘ হবে না। আপনারা প্রস্তুত থাকুন। চূড়ান্ত ডাক আসলে সকলকে বের হতে হবে। আমরা সবাই এই যুবকদের সঙ্গে আছি। আমাদের জীবনে যা পাওয়ার পেয়ে গেছি, এখন সব তোমাদের জন্য লড়ব।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটের গণরায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এই লংমার্চের আয়োজন করে।
লংমার্চে বাধা দিলে ৬ দফা ১ দফায় পরিণত হবে: সরকার লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে লংমার্চের ৬ দফা এক দফায় পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। গতকাল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ-পূর্ব সমাবেশে বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যতই বাধা আসুক না কেন, আমাদের এই লংমার্চ চট্টগ্রামেই পৌঁছাবে ইনশা আল্লাহ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা বাংলাদেশের মানুষ লংমার্চ টু ঢাকায় সবাই একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে ছিল। এবার আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য বিভাগের উদ্দেশ্যে লংমার্চের যাত্রা শুরু করেছি, নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে যাচ্ছে সেই স্বৈরাচার হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য। আমাদের এই লংমার্চ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে লংমার্চ। এই লংমার্চ যারা তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে তাদের বিরুদ্ধে লংমার্চ।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, যারা ৭০ শতাংশ জনগণের গণরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এই লংমার্চ। ফলে আমরা জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা দলে দলে এই লংমার্চে অংশগ্রহণ করুন। এই লংমার্চ কোনো ১১ দলের লংমার্চ নয়, এই লংমার্চ বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষের লংমার্চ। আমরা লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবো, যদি সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে এই লংমার্চের ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
লংমার্চ সরকার পতনের আন্দোলন নয়: ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ সরকারের পদত্যাগ বা সরকার পতনের আন্দোলন নয়, এটি সরকারের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। গতকাল ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে পথসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. তাহের বলেন, এই মুহূর্তে সংসদে এবং সংসদের বাইরে যে লংমার্চ বা আন্দোলনে আছি তা সরকারপতনের আন্দোলন নয়, এটা সরকারের জন্য ওয়েক-আপ কল।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি শুরু করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য। জনগণের চাহিদা এবং দাবি জানাতেই এ আন্দোলন। আমরা আশা করব এ আন্দোলনের পর সরকারের বোধোদয় হবে। সমস্যা সমাধানে তারা যৌক্তিক পরিকল্পনা করবে।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা।
এদিন দুপুর থেকে বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণাংশে পথসভাস্থলে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। ফেনীর ছয় উপজেলা ছাড়াও পাশের নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। পথসভা শেষে লংমার্চটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

