-67bfe6670626d.jpg)
ইলমে দ্বীনের মূল উৎস আল কোরআন এবং হাদিসের বিশাল ভান্ডার। দুটিরই ভাষা আরবি। শরয়ী ইলমের জগতে প্রবেশের পূর্ব শর্ত আরবি ভাষার বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন জ্ঞান। ভাষার বৈশিষ্ট্য, ব্যবহারবিধি, অলঙ্কার, কোরআন অবতরণ ও হাদিস বর্ণনাকালীন সমাজের মানুষের বাগরীতি সম্পর্কে সম্মক ধারণা। আরবি বর্ণমালা দিয়ে এই ইলমের সূচনা। অর্জন করতে হয় ভাষার উপর চারটি দক্ষতা। পঠন, কথন, শ্রবণ ও লিখন দক্ষতা। পড়তে হয় আরবি ভাষার ব্যাকরণ নাহু-সরফ, অলঙ্কার শাস্ত্র ইলমে বালাগাত, কোরআনের ব্যাখ্যামূলক তরজমা, তাফসীরের মূলনীতিশাস্ত্র উসূলে তাফসীর, ইসলামী আইনের মূলনীতিশাস্ত্র উসূলে ফিকাহ, হাদিসের মূলনীতিশাস্ত্র উসূলে হাদিস, ফতোয়ার মূলনীতিশাস্ত্র উসূলে ইফতা ইত্যাদি। এগুলো যথাযথভাবে পড়ার পর একজন মানুষের মাঝে অর্জিত হয় কোরআন ও হাদিস বোঝার প্রাথমিক যোগ্যতা। বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের জন্য উদ্দিষ্ট বিষয়ে গ্রহণ করতে হয় বিজ্ঞ উস্তাযের সান্নিধ্য। অধ্যয়ন ও গবেষণা চালিয়ে যেতে হয় দীর্ঘকাল। ইন্টার্নশীপের পর অর্জন হয় শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞতা। এরপরও শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির কথা কেবল নিজ শাস্ত্রের ক্ষেত্রেই বিবেচ্য। এক শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির মন্তব্য অন্য শাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য নয়। কারণ لكل فن رجال প্রত্যেক বিষয়েরই রয়েছেন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ছাড়া অন্য কারো দখলদারিত্ব সেখানে অনধিকার চর্চা। কৃষি বিশেষজ্ঞের কাছে যেমন চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শ চায় না কেউ, ডাক্তার যেমনিভাবে নাক গলানোর অধিকার রাখে না ইঞ্জিনিয়ারের কাজে ; তেমনি কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে যতোই বিশেষজ্ঞ হোন না কেন; অন্য বিষয়ে তার দখলদারিত্ব সাজে না।
এবার আসি উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় ইলমে দ্বীনের সর্বাধিক চর্চা (তুলনামূলক) কোথায় হয়, সেই আলোচনায়। কাউকে বা কোনো শিক্ষাধারাকে খাটো করা নয়; কেবল বাস্তব চিত্র তুলে ধরাই উদ্দেশ্য এখানে।
২। জেনারেল ও দ্বীনি বিষয়ে সমন্বিত আলিয়া শিক্ষাধারা।
৩। শুধুমাত্র সাধারণ শিক্ষার প্লাটফর্ম স্কুল-কলেজ কেন্দ্রিক শিক্ষাধারা।
কওমী শিক্ষাধারা—
বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ। সংগত কারণে সকল ধারাতেই ব্যাপক কিংবা সীমিত পরিসরে ইসলামী জ্ঞান চর্চার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মাঝে কওমী সিলেবাসটাকে সাজানোই হয়েছে কোরআন -হাদিস বোঝার উপযোগী সকল পাঠ্য বিষয়ের সমন্বয়ে। এ সিলেবাসে একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৪ বছর শুধুমাত্র কোরআন হাদিস বোঝার মাওকূফ আলাইহি (উপকরণ) বিষয়গুলো নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অধ্যয়ন করে। জেনারেল বিষয়গুলো মৌলিক জ্ঞানার্জনের মাঝে রাখা হয় সীমাবদ্ধ। (এ সিলেবাসে আরো কিছু জেনারেল বিষয় সংযোজন করার প্রয়োজন আছে কী না সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।) বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত শিক্ষাদান থেকে শুরু করে ইসলামী জ্ঞানের সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত পঠন ও পাঠদান করা হয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায়। শিক্ষার্থীরা একাগ্রতার সাথে নিমগ্নচিত্তে ওহির জ্ঞান আহরণ করে সুদীর্ঘকাল। হাদিসের বিশুদ্ধতম ছয়টি সংকলন তথা সিহাহ সিত্তাহ এর পাঠ গ্রহণ করে সরাসরি বিজ্ঞ উস্তাযদের কাছ থেকে। বিভিন্ন বিষয়ের উপর লাভ করে বিশেষায়িত অধ্যয়নের ডিগ্রি। এতদসত্ত্বেও ইলমি অবস্থান ও স্তরবিন্যাসে এরকম একাডেমিক শিক্ষাধারায় পড়াশোনা করা আলেমদেরকে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ৭ম স্তর তথা সাধারণ জনগণের স্তরে রেখেছেন। যাদের কাজ কেবল পূর্বসূরী ফকীহ ও মুজতাহিদদের ফতোয়াগুলো প্রকাশ করা এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমল করা। কোরআন হাদিস ঘেঁটে শরীয়তের সিদ্ধান্ত বের করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এদের মাঝেও অবর্তমান।
এই স্তর বিন্যাস থেকে মাযহাবের ইমামদের ইলম, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ইলমী গভীরতাগত অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যায়। পাশাপাশি বর্তমান যমানার একাডেমিক পড়াশোনা সমাপ্ত করা মাওলানা ও মাযহাবের মুজতাহিদ উলামায়ে কেরামের মাঝে ইলমি স্তরগত ফারাকও স্পষ্ট হয়ে যায়। মাযহাবের ইমামদের অবস্থান সর্বশীর্ষে। সমকালীন মাওলানাদের অবস্থান তালিকার সর্বনিম্ন। তবে ইতোপূর্বে ঘটেনি এমন কোনো অভিনব বিষয় হলে উম্মাহর বিচক্ষণ উলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তও সেক্ষেত্রে শরীয়তের একটি গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে গণ্য।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আলিয়া শিক্ষাধারা এখন আগের অবস্থানে নেই। সিংহভাগ আলিয়া মাদরাসায় না আছে শিক্ষা, না আছে দীক্ষা, না আছে ইসলামী চেতনা ও দ্বীনি চিন্তার পরিচর্যা। বর্তমানে আলিয়া মাদরাসার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য থাকে দাখিল ও আলিম পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়া। চাহিদাসম্পন্ন কোনো জেনারেল বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করা। দ্বীনি বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জনের প্রতি না থাকে তাদের কোনো আকর্ষণ, না সেটি তাদের লক্ষ্য। ফলে জেনারেল বিষয়গুলো তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেও ধর্মীয় বিষয়গুলো থাকে সবসময় উপেক্ষিত ও গুরুত্বহীন। এভাবে আলিম পর্যন্ত পড়ার পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পাড়ি জমায় ভার্সিটিতে। কন্টিনিউ করে না মাদরাসা শিক্ষা। ভালো কোনো ইউনিভার্সিটিতে যারা সুযোগ পায় না বা পেলেও অতিরিক্ত হিসেবে আলিয়ার সার্টিফিকেটও অর্জন করতে চায়, তারা শুধু ফাজিল/অনার্স ও কামিল পরীক্ষায় নামেমাত্র অংশ নিয়ে সার্টিফিকেট লাভ করে।
তাদের ইলমী ও আমলি অবস্থা কারোই অজানা নয়। এদের মাঝে এমন ছাত্রের সংখ্যাও কম নয়, যারা কামিল পর্যন্ত পড়ার পরও নিজের নামটা বিশুদ্ধভাবে লিখতে পারে না আরবিতে। বেশির ভাগের অবস্থা এই যে, তারা আরবি কিতাবের এক লাইন এবারতও সঠিকভাবে পড়ে তার অনুবাদ করতে সক্ষম নয়। এটাই বাস্তবতা। তবে এর ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই; তা বলবো না। কামিল স্তর পর্যন্ত ওঠে গেলেও ৯৫% ভাগ ছাত্রের শুদ্ধ নয় কোরআন তেলাওয়াত। কোরআন হাদিস বোঝা তো দূরের কথা, কোরআন হাদিসের প্রাথমিক স্তরের জ্ঞানও অর্জন হয় না অনেকের। নোট গাইড পড়ে বিভিন্ন কৌশলে কেবল পরীক্ষায় পাস করে।
তবে সরকারি স্বীকৃতি থাকায় এদেরই কেউ কেউ আবার আলিমের সার্টিফিকেট দিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি আবেদনের সুযোগ পেয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন সরকারি কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কেউ ইসলামিক কোনো বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করে। আবার কেউ দেশের বাইরে মিশরের আল আজহার, মদীনার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কিংবা সৌদি আরবের কোনো ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নের সুযোগ গ্রহণ করে। লাভ করে চটকদার খেতাব ও নিসবতের অধিকার।
স্মর্তব্য, আমাদের দেশের সরকার সেক্যুলার মানসিকতার হওয়ায় ভার্সিটিগুলোতে ধর্মীয় বিষয়গুলোকে খুবই নি¤œমানের সাবজেক্ট মনে করা হয়। কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়ন এবং গুরুত্বও দেওয়া হয় কম। ফলে সাধারণত কোনো শিক্ষার্থীর প্রথম পছন্দ থাকে না ধর্মীয় বিষয়। অন্য কোনো কাঙ্খিত সাবজেক্ট না পেলে অনেকটা অপারগতাবশত গুরুত্বহীনভাবে ধর্মীয় সাবজেক্টে অনার্স মাস্টার্স করে। তো এরকম নড়বড়ে ভিত্তি নিয়ে সার্টিফিকেটের ফাঁকফোকর গলিয়ে কেউ যদি ধর্মীয় কোনো বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স বা পিএইচডি করে নিজেকে ইমাম কিংবা ধর্মের ব্যাপারে সবজান্তা ভাবতে থাকে, সেটা যেমন তার জন্য বাতুলতা। কেবল এসকল সার্টিফিকেটের কারণে তাকেই একমাত্র আল্লামা বা ইসলামিক স্কলার ধরে নেওয়াটা সাধারণ জনগণের জন্য চরম মূর্খতা।
প্রচলিত তিন ধারায় ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিদের জ্ঞানের দৌড় এতটুকুই। যা আমি উল্লেখ করলাম। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এরকম ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন ব্যক্তিই যদি আজকে মিডিয়ার সামনে একটা দু’টা কথা বলতে পারে, আমরা তাকে আল্লামা, মুফতি, ইসলামিক স্কলার বানিয়ে দেই। আর হাজার বছর ধরে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে বরিত, স্বীকৃত, ফকীহ, মুজতাহিদ, মুত্তাকী ব্যক্তির দালীলিক সিদ্ধান্তকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে থাকি। এগুলো দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
বিখ্যাত তাবেঈ মুহাম্মদ ইবনে সীরীন রহ. বলেছেন, إن هذا العلم دين، فانظروا عمن تأخذون دينكم""
অর্থাৎ এই ইলমই হলো দ্বীন। সুতরাং লক্ষ্য করো, কার নিকট হতে তোমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছো। [সুনানে দারেমি]
অতএব, দ্বীনের কথা প্রচারকারী ব্যক্তির সততা, যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে তার কথা গ্রহণ বা বর্জন করা দ্বীনি কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।
পূর্বসূরী ফোকাহাদের অনুসরণ কেন নিরাপদ? কারণ,
১। তাঁরা আমাদের চেয়ে রাসূলের যুগের কাছাকাছি সময়ের মানুষ ছিলেন। যাদের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষ্য দিয়েছেন।
২। তাঁদের ইলম ও প্রজ্ঞা ছিল গভীর। দৃষ্টি ছিল তীক্ষè। দ্বীনকে গভীরভাবে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করার পিপাসা ছিল প্রবল।
৩। তাঁরা ছিলেন আমাদের তুলনায় অনেক বেশি খোদাভীরু ও পরহেযগার। দীনের বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে
ছিলেন অতি সতর্ক।
৪। কালের ব্যবধান কম থাকায় রাসূলের যুগের আমলকে অবিকৃত অবস্থায় দেখার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা।
৫। সময় ও ভৌগলিক দূরত্ব কম থাকায় রাসূলের যুগের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাঁদের পার্থক্য ছিল কম। ফলে সমকালীন মানুষ কোন বিষয়টি কীভাবে বলেছেন কী উদ্দেশ্যে বলেছেন, কোন কথার মর্ম কী, কোন কাজের প্রেক্ষাপট কী? এসব বিষয়ে তাঁরা ছিলেন অধিক জ্ঞাত।
৬। সর্বোপরি তাঁরা ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ তাওফীক প্রাপ্ত। দ্বীন ও উম্মাহর এ মহান কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য মনোনীত।
৭। তাঁদের সময়ে ইসলামে ভেজাল মানুষের পরিমাণ যেমন কম ছিল, তেমনি ইলমি অঙ্গনও ছিল ভেজালমুক্ত।
৮। ইজতিহাদ ও গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ পার্শ¦-প্রতিক্রিয়া মুক্ত। তাঁদের মাঝে না ছিল ক্ষমতার লোভ, না ছিল ক্ষমতাসীনদের ভয়। দুনিয়াবি মোহ, খ্যাতি বা শ্রæতির প্রতি তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিল না। শরীয়তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়াই ছিল তাঁদের চেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালে মুক্তি ছিল তাদের লক্ষ্য।
এসব বৈশিষ্টের কারণে দ্বীনি কোনো বিষয়ে আমাদের চেয়ে তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি।
১। দীনের প্রতি দরদ আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই তার জ্ঞান ও প্রতিভার গণ্ডির ভিতরে থেকে সঠিক তরীকায় দ্বীনের খেদমত করতে পারে। এক্ষেত্রে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, আমি যেন উম্মাহর নতুন ফেতনার দ্বার না হই। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
طوبى لعبد جعله الله مفتاحا للخير ومغلاقا للشر وويل لعبد جعله الله مفتاحا للشر ومغلاقا للخير
‘সুসংবাদ ঐ বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ কল্যাণের দ্বার উন্মোচনকারী এবং অকল্যাণের দ্বার রুদ্ধকারী বানিয়েছেন। আর ধ্বংস ঐ ব্যক্তির জন্য যাকে আল্লাহ অকল্যাণের দ্বার উন্মোচনকারী এবং কল্যাণের দ্বার রুদ্ধকারী বানিয়েছেন।’
২। পূর্বসূরীদের মাঝে সিদ্ধান্তকৃত বিষয়গুলোকে নতুন করে আলোচনার বস্তু না বানানো। চর্বিত চর্বন না করে নতুন সমস্যা ও আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা।
৩। পূর্বসূরীদের প্রতি নিজে শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং শ্রোতাদেরকেও শ্রদ্ধাশীল হওয়ার সবক দেওয়া। মনে রাখতে হবে বৃক্ষের শাখায় বসে তার গোড়ায় কুঠারাঘাতকারী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকা।
৪। সাধারণ শ্রোতাদের সামনে ইখতিলাফি মাসআলাগুলো না বলে শুধু জুমহুরের সিদ্ধান্তগুলো উল্লেখ করা।
৫। শরীয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত একাধিক আমলের কোনো একটি কোনো এলাকায় বা জনগোষ্ঠির মাঝে প্রচলিত থাকলে, সেখানে ভিন্ন আমলের প্রচার না করা। এতে মুসলিম সমাজের ঐক্য বিনষ্ট হয়। আমলের প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়।
৬। স্বীকৃত, সর্বজন শ্রদ্ধেয় পূর্বসূরী উলামায়ে কেরামের তুলনায় নিজের অযোগ্যতার অনুভূতি সর্বদাই অন্তরে জাগ্রত রাখা। কোনো এক বুযুর্গ বলেছেন, لو سكت من لا يعلم لسقط جميع الاختلاف ‘যারা জানে না তারা যদি এই না জানার অনভূতি নিয়ে চুপ থাকতো, তাহলে সিংহভাগ মতভেদেরই মীমাংসা হয়ে যেত। নতুন নতুন মতবাদের জন্ম হতো না।’
৭। শ্রোতার বুঝশক্তি অনুসারে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা। সাধারণ মানুষের সামনে ফিকাহ ও আকাইদের জটিল ও মতভেদপূর্ণ বিষয় বা হাদিসের মানগত বিশ্লেষণে না জড়ানো।
৮। নসীহামূলক আলোচনাকে প্রাধান্য দেওয়া। ফতোয়া কিংবা মাসআলা-মাসায়েলের আলোচনা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা।
৯। দৈনন্দিন জীবনে দ্বীনি বিষয়ের যেকোনো সমাধানের জন্য স্থানীয় উলামায়ে কেরাম বা নিকটতম দারুল ইফতার স্মরণাপন্য হওয়ার পরামর্শ দেওয়া।
১০। ভাষা ও অঙ্গভঙ্গি মার্জিত রাখা। আক্রমণাত্মক না হয়ে সঠিক বিষয়টি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রতি মনোযোগী হওয়া।
২। ইসলামকে জানতে হবে স্বীকৃত যথাযথ প্রক্রিয়ায়। জানার পূর্ণতার আগে নিজেকে বিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ কিংবা নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ভাবা যাবে না।
৩। যারা বেশি জানে তাদের জানার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। তাদের পরামর্শ অনুসারে জানার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।
৪। কোনো প্রযুক্তি বা শুধু বই-পুস্তককে চূড়ান্ত অভিভাবক বানানো যাবে না। সরাসরি কোনো আলেমের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তার কাছ থেকে সমাধান নিতে হবে।
৫। ইসলামকে ইসলাম ভিন্ন অন্য কোনো ধর্ম ও দর্শন দিয়ে জাস্টিফাই (বিচার) করা যাবে না।
৬। ইসলামের প্রাবল্য অন্তরে থাকতে হবে। অর্থাৎ ইসলামের সাথে কোনোকিছু সাংঘর্ষিক মনে হলে ইসলামকে প্রাধান্য দেওয়ার মত ঈমানী শক্তি থাকতে হবে। বিভিন্ন মত ও দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ইসলামের অপব্যাখ্যায় লিপ্ত হওয়া যাবে না।
৭। আপনার জন্য অধ্যয়ন উপযোগী বই কোনটি তা একজন আলেমের কাছে জেনে তারপর তা সংগ্রহ করে পড়তে হবে।
৮। যেকোনো বই-পুস্তক পড়ার পর বা ওয়াজ-নসীহাহ শোনার পর কোনো বিষয়ে সংশয় হলে, একজন আলেমের শরণাপন্য হোন। তাঁর সাথে আলোচনা করে বিষটি ভালো করে বুঝে নিন।
৯। শুধু ঈমান ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করুন। যে সকল বিষয়ের সাথে সওয়াব বা ইকাব (শাস্তি) সম্পৃক্ত নয়, সেগুলোর পিছনে অনর্থক মেধা ও সময় নষ্ট করবেন না।
১০। বিতর্ক ও বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে চলুন। মসজিদ-মাদরাসা ও আলেম-উলামাদের সাথে হৃদ্ধতাপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখুন।
মনে রাখবেন!
إن من أعظم البلية تشيخ الصحيفة.
ধর্মীয় ব্যাপারে বর্তমানে সবচে বড় ফেতনা হচ্ছে গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, কোনো লেকচার বা বইপুস্তককে সর্বোচ্চ অভিভাবক ও গাইড হিসেবে গ্রহণ করা। অতএব আমাদের এসব ডিভাইস নির্ভরতা কমাতে হবে। ওলামায়ে কেরাম এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রতি আস্থাশীল হতে হবে।
আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন!
- বাংলাদেশের খবরের ইসলাম বিভাগে লেখা পাঠান এই মেইলে- [email protected]
লেখকের মেইল : [email protected]
বিএইচ/