Logo

ধর্ম

রোজা তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম

Icon

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ২২:৫২

রোজা তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম

রমজান মাস আল্লাহ প্রদত্ত এক অনন্য নেয়ামত। এ মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সমস্ত দরজা উন্মুক্ত করে দেন। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিন বান্দা নফসের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩) তাকওয়া অর্থ আল্লাহর ভয়ে সকল পাপকাজ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। 

তাকওয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত: ইসলামের ইতিহাসে তাকওয়ার যে গভীর ও হৃদয়স্পর্শী ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ও উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর সেই বিখ্যাত সংলাপ।

উমর (রা.) ছিলেন ন্যায়পরায়ণতা, দৃঢ়তা ও আল্লাহভীতির উজ্জ্বল প্রতীক। দ্বীনের সূ² বিষয়গুলো জানতে তিনি সর্বদা উদগ্রীব থাকতেন। তাকওয়া সম্পর্কে জানতে একদিন তিনি উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর শরণাপন্ন হলেন। কারণ উবাই ইবনে কাব (রা.) ছিলেন কোরআনের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন একজন সাহাবি। উমর (রা.) প্রশ্ন করলেন, ‘তাকওয়া কী?’

উবাই ইবনে কাব (রা.) সরাসরি সংজ্ঞা না দিয়ে একটি উপমার আশ্রয় নিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথ দিয়ে হেঁটেছেন?’ উমর (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ উবাই ইবনে কাব (রা.) আবার প্রশ্ন করলেন, ‘তখন আপনি কীভাবে চলতেন?’ উমর (রা.) উত্তরে বললেন, ‘আমি অত্যন্ত সতর্ক হয়ে হাঁটতাম, কাপড় গুটিয়ে নিতাম এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম যেন কাঁটা আমার গায়ে না লাগে।’ তখন উবাই (রা.) বললেন, ‘এটাই তাকওয়া।’

ঘটনার শিক্ষা: এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাকওয়ার পূর্ণ দর্শন। দুনিয়ার জীবন যেন এক কাঁটায় ভরা পথ। এখানে শয়তানের কুমন্ত্রণা, নফসের কুপ্রবৃত্তি ও নানা প্রলোভন মানুষকে ঘিরে রাখে। যে ব্যক্তি প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতন থাকে, নিজের আমল ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, গুনাহ থেকে বাঁচতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, সে-ই প্রকৃত মুত্তাকি। কাঁটার ভয়ে যেমন পথিক তার পোশাক গুটিয়ে নেয় এবং সাবধানে হাঁটে, তেমনি মুত্তাকি ব্যক্তি তার দৃষ্টি, জিহ্বা, হৃদয় ও কর্মকে আল্লাহর ভয়ে সংযত রাখে।

এই ঘটনার শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত রমজানের মতো আত্মশুদ্ধির মাসে। যদি আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কাঁটাযুক্ত পথের উপমা স্মরণ রাখি, তবে গুনাহ থেকে বাঁচা আমাদের জন্য সহজ এবং তাকওয়ার পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।

তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম: রোজা তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। রোজাদার ব্যক্তি সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করেও কেবল আল্লাহ তাআলার ভয়ে হালাল খাবার থেকেও বিরত থাকে। এই অনুশীলনই তার মধ্যে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ সবকিছু দেখছেন, তখন সে গোপনেও কোনো ধরনের পাপকাজ করতে সাহস পায় না।

রোজা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে। ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারলে অন্যায় প্রলোভনও সহজে প্রতিহত করা যায়। রোজাদার ব্যক্তি মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা ও ক্রোধ থেকে বিরত থাকে, পাপাচার থেকে বিরত থাকাই তাকওয়ার মূল ভিত্তি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যাচার ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩) এভাবে রোজা মানুষকে শুধু বাহ্যিক নয়, আভ্যন্তরীণভাবেও পরিশুদ্ধ করে এবং প্রকৃত তাকওয়াসম্পন্ন মুমিন হিসেবে গড়ে তোলে।

রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। এ মাসে অর্জিত তাকওয়া যদি একজন মুমিনের সারা বছরের জীবনকে পরিচালিত করে, তাহলেই রমজানের সত্যিকারের সার্থকতা প্রমাণিত হয়। রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে যে আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয়, তা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনকে সুন্দর করে তোলে। তাই আসুন, রমজানকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালন না করে প্রকৃত তাকওয়া অর্জনের সংকল্প নিই এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর