আমরা জানি, মানব রচিত গ্রন্থের শুরুতেই ভুল-ভ্রান্তির জন্য পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয় এবং পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর কিতাব পবিত্র কোরআন এর ব্যতিক্রম। এই কিতাবের শুরুতেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে—এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত। (সূত্র: সুরা বাকারা, আয়াত: ২)
হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে অকাট্য সত্য আল্লাহর কিতাব আল-কোরআন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা একদম ত্রুটিহীন এবং সব ধরনের সংশয়-সন্দেহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আজ থেকে বহু যুগ পূর্বে আরব ভূমিতে লালিত-পালিত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাজিল হয়েছে এই কোরআন। সেই কোরআন এখন আমাদের হাতে হাতে। কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুত্তাকিদের জন্য তা হিদায়াত।
সর্বপ্রথম মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের অবস্থান ছিল লাওহে মাহফুজে। লাওহে মাহফুজ হলো এমন সংরক্ষিত ফলক, যেখানে গোটা সৃষ্টির সমস্ত ঘটনা এবং কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু সংঘটিত হবে, সবই আল্লাহর হুকুমে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আল্লাহর কিতাব কোরআন সেখানেই সংরক্ষিত ছিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন—বরং এটি সম্মানিত কোরআন, যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত। (সূত্র: সুরা বুরুজ, আয়াত: ২১–২২)
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে লাওহে মাহফুজ থেকে বাইতুল ইজ্জাহতে সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে নাজিল করেন। বাইতুল ইজ্জাহ হলো প্রথম আসমানের একটি বিশেষ স্থান, যেখানে সম্পূর্ণ কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তারপর সেখান থেকে আল্লাহর বাণী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর প্রয়োজনমাফিক অল্প অল্প করে দীর্ঘ তেইশ বছর যাবত অবতীর্ণ হয়।
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন—কোরআনকে ‘জিকর’ (লাওহে মাহফুজ) থেকে আলাদা করা হয়েছে। অতঃপর তা দুনিয়ার আসমানের ‘বাইতুল ইজ্জাহ’-তে রাখা হয়েছে। এরপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম তা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নাজিল করতে থাকেন। তিনি তা সুস্পষ্টভাবে পাঠ (তারতিল) করতেন। (সূত্র: আল-মুস্তাদরাক, ২৯২১)
লাওহে মাহফুজ থেকে বাইতুল ইজ্জাহতে সম্পূর্ণ কোরআন নাজিল হয়েছিল রমজান মাসের লাইলাতুল কদর বা শবে কদরে। মহান আল্লাহ পাক এ ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন—নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। (সূত্র: সুরা কদর, আয়াত: ১)
আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনাও রমজান মাসে সংঘটিত হয়েছিল। রমজানের ঐতিহাসিক সেই দিনে তিনি হেরা গুহায় প্রভুর ইবাদত ও ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তখন সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নিয়ে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে নবুওয়তের সম্মানে ভূষিত হন। এরপর থেকে দীর্ঘ তেইশ বছর যাবত তাঁর উপর প্রয়োজনমাফিক অল্প অল্প করে ওহি নাজিল হতে থাকে।
অকাট্য দলিল দ্বারা এই কথা প্রমাণিত যে, যখনই পবিত্র কোরআনের কোনো অংশ অবতীর্ণ হতো, তখনই আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করতেন। প্রসিদ্ধ কয়েকজন সাহাবি রাযিয়াল্লাহু আনহুম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাজিলকৃত ওহি লেখার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে আয়াত নাজিল হতো। কোন আয়াতগুলো কোন সুরায় কীভাবে বিন্যস্ত হবে—মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে স্বীয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিতেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ অনুযায়ী ওহি-লেখক সাহাবিগণ বিভিন্ন সুরার আওতায় আয়াতগুলোকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত করে লিখে রাখতেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়ই যে কোরআন লিপিবদ্ধ হয়েছে, তার একটি জ্বলন্ত সাক্ষী হচ্ছে কোরআনুল কারিমের এই আয়াত—আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে প্রেরিত একজন রাসুল (হলেন মুহাম্মদ), যিনি আবৃত্তি করেন পবিত্র পুস্তিকাসমূহ। (সূত্র: সুরা বাইয়িনা, আয়াত: ২)
আয়াতে উল্লেখিত ‘পবিত্র পুস্তিকাসমূহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রাসুলের নির্দেশনায় সাহাবিগণ কর্তৃক লিপিবদ্ধ কোরআনের সেই পাণ্ডুলিপিগুলো। পুস্তিকাসমূহ বা পাণ্ডুলিপিগুলো বলার কারণ হলো, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সম্পূর্ণ কোরআন লিপিবদ্ধ করা হলেও সেগুলো একত্রিত অবস্থায় ছিল না। বরং খেজুরের ডাল, চামড়া, হাড়, স্বচ্ছ পাথর ও কাঠফলকে পৃথক পৃথক অবস্থায় ছিল। তবে সুরাসমূহের আওতায় আয়াতসমূহ বিন্যস্তভাবে ছিল।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ কোরআন একত্র অবস্থায় না রাখার কারণ হলো, মহান আল্লাহ তায়ালা যেকোনো সময় যেকোনো আয়াত বা হুকুম রহিত করে দিতে পারেন—এ সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিল। তাই এ কাজ তিনি করেননি। তাঁর ইন্তেকালের পর এই সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণ কোরআন গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
শুধু লেখনীর মাধ্যমেই নবিযুগে কোরআন সংরক্ষিত ছিল না; সংরক্ষিত ছিল অনেক হাফেজ সাহাবির স্মৃতিতেও। তাঁদের মেধাশক্তি ছিল আমাদের থেকে আরও বহুগুণ বেশি। তাই কোরআন তাঁদের স্মৃতিতে খুব ভালোভাবেই সংরক্ষিত ছিল।
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর খলিফাতুর রাসুল হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক কোরআনের হাফেজ সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। তখন হজরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে সংকলন করার জন্য হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন। তিনি এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে এই সুপরামর্শ গ্রহণ করে নেন এবং হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন।
হজরত জায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হলেন কোরআনের হাফেজ সেই সাহাবি, যিনি তখন নিকটে উপস্থিত ছিলেন, যখন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ সম্পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত করে হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে শুনিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি সেসব সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা নবিযুগে কোরআন লিপিবদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
খলিফা হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে তিনি যে কাজটি করেন, তা হলো—নবিযুগে লিখিত পবিত্র কোরআনের পাণ্ডুলিপিগুলো এক স্থানে জমা করেন। তারপর যে কয়েকজন হাফেজে কোরআন সাহাবি জীবিত ছিলেন, তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এরপর হাফেজগণের মাধ্যমে উপযুক্ত সাক্ষী-প্রমাণসহ অতি সূক্ষ্মভাবে পাণ্ডুলিপিগুলো যাচাই-বাছাই করেন। তারপর সেগুলো একত্রে লিপিবদ্ধ করে একটি মুসহাফে পরিণত করেন এবং কোরআনের প্রথম প্রামাণ্য মুসহাফ হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পেশ করেন।
এই মুসহাফের বৈশিষ্ট্য হলো— এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত ধারাক্রম অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে। সুরাগুলো আলাদা রাখা হয়েছে; সুরার ক্রমধারা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এটি সাত কিরাতে (সাত পঠনরীতিতে) লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ কপিটি হিজাজি হস্তাক্ষরে লেখা হয়েছিল। এখানে শুধু সেসব আয়াত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়নি। এই সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল—একটি সুবিন্যস্ত, গ্রন্থিত কোরআনের কপি সংরক্ষণ করা, যাতে প্রয়োজনের সময় তার দ্বারস্থ হওয়া যায়। (সূত্র: তারিখুল কুরআনিল কারিম, তাহের আল কুরদি; খণ্ড ১, পৃ. ২৮)
পবিত্র কোরআনের সেই কপি খলিফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের হেফাজতে রাখেন। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে তা আসে। পরবর্তীতে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্নী হজরত হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে সংরক্ষিত হয়।
তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইসলাম বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ইসলামের অধিক প্রচার-প্রসারের ফলে বিভিন্ন জাতি ও নানা ভাষাভাষী অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। অনারব লোকেরা আরবি ভাষার কিছু শব্দ কুরাইশদের ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতে পারত না। ফলে আঞ্চলিক উচ্চারণের প্রভাবে পবিত্র কোরআনের বিশুদ্ধ পাঠে পার্থক্য পরিলক্ষিত হতে থাকে। তাছাড়া উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর কালে কারী ও হাফেজ সাহাবিগণের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন।
আরেকটি বিষয় ছিল—আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোরআন সাত কিরাতে (সাতটি পঠনরীতিতে) অবতীর্ণ হয়েছিল। নবিযুগেই একেকজন সাহাবি একেক পঠনরীতিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুসহাফটিও সাত কিরাতে লিপিবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ একেকজন একেক পঠনরীতি অনুসরণ করতে থাকে এবং অপর পঠনরীতি অনুসরণকারীকে গালমন্দ করে বলে—‘আমার তেলাওয়াত শুদ্ধ, আর আপনার তেলাওয়াত অশুদ্ধ।’ এ নিয়ে বিভ্রান্তি ও মতভেদ সৃষ্টি হয়।
এ সমস্যাগুলো বিবেচনা করে এর সমাধানকল্পে খলিফা হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কতিপয় নীতিমালার আলোকে পুনরায় কোরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নীতিমালাগুলো হলো—
হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক সংকলিত কোরআনকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। তাঁর তত্ত্বাবধানে ও সার্বক্ষণিক পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন সংকলন প্রস্তুত করা। কোরআনের প্রমিত উচ্চারণসহ সার্বিক বিষয়ে নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ গ্রহণ করা।
জায়েজ থাকা সত্ত্বেও একই শব্দের একাধিক লিখনপদ্ধতির পরিবর্তে অভিন্ন ও প্রমিত রীতি অনুসরণ করা। লিখনরীতিতে মতভেদ হলে কুরাইশ ভাষার প্রাধান্য দেওয়া। (সূত্র: কিতাবুল মাসাহিফ, ইবনে আবি দাউদ; জামউল কুরআনি হিফজান ওয়া কিতাবাতান)
এই দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়ার জন্য তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে—যারা নবিযুগে এবং হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ওহি লিখন ও গ্রন্থায়ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন—হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি গঠন করেন।
এরপর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে সংকলিত কোরআনের মূল কপি হজরত হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে নিয়ে কমিটির সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং তাঁদেরকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁরা সাত পঠনরীতির মধ্যে কুরাইশি পঠনরীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কয়েকটি বিশুদ্ধ কপি প্রস্তুত করেন।
খলিফার নির্দেশে এসব কপি বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করা হয় এবং সকল মুসলমানকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেন মতানৈক্য পরিহারের জন্য এই প্রমিত কপির অনুসরণ করে।
অধিক সতর্কতার জন্য হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মানুষের কাছে যে সব পৃথকভাবে লিখিত কোরআনের অংশ ছিল, সেগুলো সংগ্রহ করে আদবের সঙ্গে ধুয়ে ফেলা হয় এবং পরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়—যাতে ভবিষ্যতে পঠনরীতি নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।
পরবর্তীতে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বেই মুসলমানদের উদ্যোগে হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সংকলিত কোরআনের অনুরূপ লক্ষ লক্ষ হাতে লেখা কপি তৈরি হয়।
হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সংকলিত কোরআন ছিল হুবহু হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সংকলিত কোরআনের অনুরূপ। মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণ কোরআন উপস্থাপন করেছিলেন এবং তিনি ফেরেশতাকে সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ শুনিয়েছিলেন। হজরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সংকলিত কোরআন ছিল সেই উপস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি।
অতএব দ্বিধাহীনচিত্তে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত কোরআন হুবহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের অবিকৃত কোরআন। হজরত আবু বকর ও হজরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কালে সংকলিত কোরআনে অতিরিক্ত একটি অক্ষরও সংযোজন করা হয়নি এবং একটি আয়াতও বাদ দেওয়া হয়নি। এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে— “নিশ্চয়ই আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার (পূর্ণ) হেফাজতকারী।” (সূত্র: সুরা হিজর, আয়াত: ৯)
লেখক: প্রাবন্ধিক, আলেমা

