Logo

ধর্ম

বাংলা নববর্ষ উদযাপন: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

Icon

​ফারহানা সিদ্দিক

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:৫১

বাংলা নববর্ষ উদযাপন: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

​সময়ের বিবর্তন ও আত্মোপলব্ধি: দেখতে দেখতে আমাদের জীবন থেকে আরও একটি বছর বিদায় নিল, আমাদের সামনে সমাগত নতুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। সময় এত দ্রুত বয়ে যাচ্ছে যে, ভাবতেই অবাক লাগে; পেছনের স্মৃতিগুলো মনে হয় এই তো সেদিনের। চোখের সামনে এখনো বিগত নববর্ষগুলোর চিত্র ভেসে উঠছে— রাজপথে শোভাযাত্রা, বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত রুচিসম্মত কনসার্টসহ নানা আয়োজন। নববর্ষ মানেই আনন্দ, নববর্ষ মানেই নতুন সংকল্প, নতুন কাজের পরিকল্পনা। তবে উৎসবের এই ডামাডোলে আমাদের একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাবা উচিত— আমরা আসলে কেমন সংস্কৃতি লালন করছি? সময়ের এই দ্রুত পরিবর্তন আমাদের মহান আল্লাহর সেই বাণীর কথা মনে করিয়ে দেয়: “তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পর অনুগামী করেছেন তার জন্য, যে উপদেশ গ্রহণ করতে চায় অথবা কৃতজ্ঞ হতে চায়।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬২)।

​নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেমন হবে সে ব্যাপারে জনপ্রিয় সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় মাহবুবুল হক লিখেছেন— “প্রতিটি জাতির নববর্ষ আছে। আমাদেরও আছে নববর্ষ। যেমন আছে ইরানিদের, আরবদের এবং খ্রিস্টান জগতের। ইরানিরা বা ইরান দেশের মানুষ প্রায় আড়াই-তিন হাজার বছর ধরে নওরোজ পালন করছে। নওরোজ মানে নতুন দিন। নও মানে নতুন, রোজ মানে দিন। প্রায় পনের শত বছর আগে থেকে তারা নওরোজ দিবস পালন করে আসছে। তবে পূর্বে যে ঢঙে ও যে মাত্রায় তারা নওরোজ উদযাপন করত তার মধ্যে ব্যতিক্রম হয়েছে। উৎসব ও আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে তারা শিরক ও বিদআতকে দূর করার চেষ্টা করেছে। এখনও করে যাচ্ছে। তারা আনন্দ উৎসবকে শুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করছে সেটাই বড় কথা।

​ইসলাম প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকে আরবে নববর্ষ পূর্বের মতো পালিত হয় না। মহররম মাস থেকে আরবি মাস শুরু। মহররমের এক তারিখ থেকে দশ তারিখ পর্যন্ত ধর্মীয় অনেক উৎসব থাকে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে আরবরা অনেক গুরুত্ব দেয়। সে কারণে নববর্ষের প্রথম দিনে তারা অন্য জাতির মতো হইচই করে না, নীরবে, নিভৃতে সামাজিকভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনের চেষ্টা করে।” (প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ, লেখক: মাহবুবুল হক, প্রচ্ছদ রচনা- এপ্রিল ২০১০ সংখ্যা, মাসিক নতুন কিশোরকণ্ঠ)

​সংস্কৃতিতে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ

বর্তমানে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে এক ধরনের ‘ফরমালিন’ ঢুকে পড়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেমন ফলের ভেতর বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়, তেমনি কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আমাদের সংস্কৃতিতে অপসংস্কৃতির বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। যে ফরমালিনযুক্ত সংস্কৃতি উপভোগ করে আজ আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও সমাজ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আমরা আজ নিজেদের অজান্তেই অনেক ক্ষেত্রে বিজাতীয় ও অশুদ্ধ ধারার অনুগামী হয়ে পড়ছি। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪০৩১)

​শোভাযাত্রা ও ইসলামি মূল্যবোধ

বৈশাখী মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমরা সাধারণত শোভাযাত্রা বলতে বুঝি সুন্দর ও মানানসই কিছু নিয়ে পথচলা। কিন্তু প্রচলিত শোভাযাত্রার সাথে যদি আমরা মুসলিম সংস্কৃতির তুলনা করি, তবে দেখা যায় এর কোনো মিল নেই। কারণ, এই শোভাযাত্রায় হাতি-ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিশাল আকৃতির প্রতিকৃতি বা মূর্তি বহন করা হয়, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। এর পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে:

​(ক) নৈতিক অবক্ষয় রোধ: ইসলাম একটি সর্বজনীন ও শান্তির ধর্ম। ইসলাম চায় মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও সঠিক আকিদা। কিন্তু প্রচলিত শোভাযাত্রায় নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা অনেক সময় নৈতিক অবক্ষয়, ফিতনা ও ইভটিজিংয়ের মতো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেয়। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র।” (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

​(খ) অপচয় বর্জন: ইসলাম অপচয়কে ঘৃণা করে। একটি শোভাযাত্রায় প্রতিকৃতি তৈরি, রাজপথ রাঙানো, দামি ফেস্টুন ও আলোকসজ্জার অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমকে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা স্পষ্ট অপচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তোমরা কিছুতেই অপচয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ২৬-২৭)। এই অপচয় করা টাকা দিয়ে কি আমরা দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি না? একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের বিলাসিতার চেয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি। আমরা এমনিতেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী তার ওপর যদি এমন অপচয় মহড়া চলে, তবে আমরা উন্নতি করব কী দিয়ে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” (সহীহ বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং: ১১২)

​(গ) প্রতিকৃতি নির্মাণে সতর্কতা: প্রতিকৃতি বা মূর্তি তৈরির ব্যাপারে ইসলামের কঠোর বিধান রয়েছে। পরকালে মূর্তিনির্মাতাদের বা যারা প্রাণীর সদৃশ তৈরি করে তাদেরকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য তৈরি করে (মূর্তিনির্মাতারা) তারা কঠিনতম আযাবের সম্মুখীন হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫৯৫৪)। তাই প্রাণহীন প্রাকৃতিক সুন্দর ছবি আঁকা বা দেখার সুযোগ থাকলেও প্রাণীবাদী প্রতিকৃতি গড়া ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাই বলছি, দয়া করে আপনারা যারা বিভিন্ন ছবি আঁকেন তারা অবশ্যই প্রাণীর প্রতিকৃতি বাদে ছবি আঁকবেন। কারণ প্রাণী ছাড়াও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা যায়।

​স্বকীয়তা ও সচেতনতা

দীর্ঘদিন পরাধীনতার প্রভাবে আমাদের সমাজে অনেক হিন্দুয়ানি ও পাশ্চাত্য প্রথা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। কিন্তু আমরা যারা মুসলিম, আমাদের উচিত নিজস্ব সংস্কৃতি পালন করা। এখন সময় এসেছে জেগে ওঠার। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইসলামি সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এখন অনেক সহজ। ইন্টারনেটে খুব সহজেই অনেক প্রয়োজনীয় বই পাওয়া যায়। ইহুদি-খ্রিস্টানদের সাথে সামঞ্জস্য থাকে এমন কোনো উৎসব এমন কোনো রীতিনীতি আমাদের পালন করা তো যাবেই না বরং বর্জন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া বিজাতীয়দের অনুসরণ করে সে আমার উম্মত নয়। তোমরা ইহুদি ও নাসারার অনুকরণ করবে না। ইহুদিদের সালাম হলো আঙুলের ইশারা করা আর নাসারার সালাম হলো হাতের তালুর ইশারা করা।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ২৬৯৫)। আমরা উপরোক্ত হাদিস থেকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের অনুসরণ অনুকরণ না করার পাশাপাশি সালাম দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও জানতে পারি।

​সুস্থ বিনোদনের আহ্বান

আমরা নববর্ষ উদযাপনের বিরোধী নই, বরং আমরা চাই এই উদযাপন হোক একটি সুস্থ, মার্জিত এবং নৈতিক কাঠামোর মধ্যে। আমাদের প্রত্যাশা—“নববর্ষের অনুষ্ঠানগুলো হবে গঠনমূলক, সুন্দর এবং জবাবদিহিতামূলক। যেখানে কোনো অশ্লীলতা বা অপসংস্কৃতির ছাপ থাকবে না। নববর্ষ মানেই বল্গাহীন আনন্দ বা হৈ-হুল্লোড় নয়, বরং নতুন বছর মানে বেশি বেশি কাজ আর সঠিক পরিকল্পনা। এ কাজে দেশের সব ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সবার মাঝে ইসলামি কনসার্টের মাধ্যমে ইসলামের মর্মবাণী ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অশ্লীল ও মানহীন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আনা এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

​তরুণ প্রজন্মের সংকল্প

তরুণ প্রজন্মকে একটি নির্মল ও আদর্শিক বলয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে এবং সুস্থ বিনোদনের চর্চা করে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারি। মনে রাখতে হবে, মানুষের সৎ কর্মই তাকে সফলতার স্বর্ণশিখরে নিয়ে যায়। আপনারা নতুন বছরে নতুন নতুন নেক পরিকল্পনা নিন। বিগত বছরের ভুলগুলোকে সমালোচনা করে আগামীর পথ চলাকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুটি নিয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হলো—সুস্থতা ও অবসর সময়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬৪১২)

​এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে— “যেকোনো মুসলিম ব্যক্তির উচিত সে যখন রোগহীন শরীরের ভালো স্বাস্থ্য এবং আনন্দদায়ক সচ্ছলতার নেয়ামত লাভ করবে, তখন সে যেন মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞ ব্যক্তি হওয়ার নিদর্শন হলো: মহান আল্লাহর নির্দেশগুলি মেনে চলা, তাঁর বারণকৃত বিষয়গুলি হতে বিরত থাকা। আর এই বিষয়ে যে ব্যক্তি অবহেলা করবে, সেই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ধোকায় পতিত হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সহীহ বুখারী-তাওহীদ পাবলিকেশন, ৮১/ সদয় হওয়া/কিতাবুর রিক্বাক)

​তাই সময় অপচয় না করে আল্লাহর দাওয়াত ও সুস্থ সংস্কৃতির পথে এগিয়ে চলুন। তবেই ইনশাআল্লাহ আমরা জীবনে সফল হতে পারব। আমরা মুসলমান, আমরা তো সতর্ককারী, চূড়ান্ত ফায়সালা নেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার।

​“নতুন বছর নতুন স্বপ্ন নতুন করে জাগা,

পুরনোকে শুধরে নিয়ে সঠিক পানে আগা।

নতুন বছর নতুন দিনে নতুন স্বপ্ন মনে,

আঁধার শেষে জ্বলুক আলো প্রতি জনে জনে।’’


লেখক: প্রাবন্ধিক

সালনা, গাজীপুর, ঢাকা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন