Logo

ধর্ম

সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা

Icon

যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬

সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করে বলেছেন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। তাঁর সাথিরা কাফেরদের প্রতি কঠোর। নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সিজদার চি‎হ্ন। (সুরা: ফাতহ, আয়াত: ২৯)

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণের জন্য যে শুধু আল্লাহই যথেষ্ট, সেই কথা উল্লেখ করে কোরআনের আরেক জায়গায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, হে নবী, আপনার ও আপনার অনুসারী মুমিনদের জন্য (সর্বক্ষেত্রে) আল্লাহই যথেষ্ট। (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৪)

আর সে কালে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী মুমিনগণ ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম।

প্রথম অগ্রগামী মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণের প্রতি মহান আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট এবং তাঁদের জন্য তিনি জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন বলে আল কোরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়। যেসব মুমিন-মুসলমানরা নিষ্ঠার সাথে সাহাবিগণের অনুসরণ করেছে, তাদের প্রতিও আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তাদেরকে জান্নাত দান করবেন। আল্লাহ পাকের ইরশাদ- মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য। (সুরা: তাওবা, আয়াত: ১০০)

সাহাবিগণের অনুসরণ করা মানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। কারণ, তাঁরা ছিলেন আল্লাহর পছন্দ মাফিক পুরোপুরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী। তাই তো আল্লাহ পাক সাহাবিগণের অনুসরণ করতে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এবার জেনে নেই, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কী বলেছেন?

হজরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবিগণের সমালোচনা করো না। তোমরা আমার সাহাবিগণের সমালোচনা করবে না। সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ উহুদ পাহাড় বরাবর স্বর্ণ ব্যয় করে, তাহলেও তাঁদের কারোর এক মুদ অথবা অর্ধ মুদ্দের সমান হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৫৪০)

এ হাদিস দ্বারা আমরা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সাহাবাগণ মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান। আমাদের মধ্য থেকে কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ নেক কাজ করলেও সাহাবাগণের অর্ধেক মুদ পরিমাণ নেক কাজের সমান হবে না।

হজরত আত্বা রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার সাহাবির সমালোচনা করে, তার উপর আল্লাহর অভিশাপ। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং-৩৩০৮৬)

যারা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অভিশাপপ্রাপ্ত হতে চায়, তারাই একমাত্র সাহাবিগণের সমালোচনা করার সাহস পায়। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। 

সাহাবিগণের পরস্পরের মধ্যে কিছু মতভেদ, সামাজিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একে অপরের সাথে বিরোধ-লড়াই হতেই পারে। তাই বলে তাঁদের সমালোচনা করা জায়েজ নেই। তাঁদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি ভুল বুঝাবুঝি ও ইজতিহাদি মতপার্থক্যের কারণে ঘটেছে। এতে তাঁদের তাকওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়ার মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কারণ, যাদের ভুল-ভ্রান্তি ও গোনাহ অনেক কম আর সৎ কাজ অনেক বেশি, তাদেরকে সৎ ও নেককার মানুষ বলেই গণ্য করা হয়। তাঁদের সামান্য কিছু গোনাহ অগণিত নেক কাজ ও তাওবা দ্বারা মুছে যায়।

সাহাবিগণ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিকট অত্যাধিক মর্যাদাসম্পন্ন এবং আমাদের থেকে কোটি কোটি গুণ বেশি নেককার। তাই তাঁদের সমালোচনা শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি মাসআলাগত দিক দিয়ে সাহাবাগণের প্রতি সমালোচনাকারী কঠিন শাস্তি পাবার যোগ্য, যে পর্যন্ত না সে আল্লাহর নিকট তাওবা-ইস্তেগফার করে এবং তাঁদের সমালোচনা করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত হয়।

ইসলামের সঠিক পথ যাচাইয়ের মাপকাঠি হলো সাহাবায়ে কেরাম। যারা তাঁদের অনুসরণ না করে তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা প্রকৃত ইমানদার নয়; বরং গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট।

পরিশেষে এই ব্যাপারে দুজন মহান মনীষীর উক্তি উল্লেখ করে এই আলোচনা সমাপ্ত করছি।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি হজরত মাইমুনি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলেছেনÑ হে আবুল হাসান, যখন আপনি দেখবেন কোনো ব্যক্তি সাহাবাগণের মাঝে কোনো সাহাবির ব্যাপারে সমালোচনা করছে, তাহলে বুঝে নিবেন তার (ইমান আর) ইসলামে খাদ আছে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯, ইফাবা-৮/২৬৫)

শামসুল আইয়িম্মাহ সারাখসি রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবের একাধিক স্থানে সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসা করেছেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় ইরশাদে সাহাবাগণকে খাইরুন্নাস তথা সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর এ লোকেরা সেই যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ যে যুগে আমি নবী রয়েছি।’ ইসলামি শরিয়ত সাহাবাগণের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়ে আমাদের পর্যন্ত এসেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সমালোচনা করবে, সে মুলহিদ। ইসলামের দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী। যদি সে ব্যক্তি তওবা না করে, তবে তার সমাধান শুধু তলোয়ার। (উসুলে সারাখসি-২/১৩৪)

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন