সুপ্রাচীনকাল থেকে আংটি সভ্যতার প্রতীক হিসেবে গণ্য। আল্লাহর নবী হজরত সুলাইমান (আ.) ও হজরত দানিয়াল (আ.)-এর আংটির কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। প্রাচীন যুগ থেকেই রাজা-বাদশাহ ও সম্মানিত ব্যক্তিরা আংটি পরতেন। আংটিতে বিশেষ চিহ্ন সংবলিত মোহর থাকত, যা দ্বারা দলিল-দস্তাবেজে সিল মারা হতো।
শুরুর দিকে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো আংটি ব্যবহার করতেন না। হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে যখন তিনি আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামি দাওয়াতের মিশন শুরু করলেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের নামে পত্র পাঠানোর ইচ্ছা করলেন, তখন তাঁকে জানানো হলো অনারব বাদশাহগণ সিলমোহর ছাড়া কোনো পত্র গ্রহণ করেন না। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আংটি তৈরি করান। (নাসায়ি: ২/২৯৪)
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অনারব রাজা-বাদশাহদের কাছে দাওয়াতপত্র প্রেরণের সংকল্প করেন, তখন তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা সিল ছাড়া চিঠি গ্রহণ করে না। তাই তিনি একটি আংটি তৈরি করান। তাঁর হাতের নিচে রাখা আংটিটির ঔজ্জ্বল্য যেন আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। (মুসলিম: ৬৫০২)
প্রথমে সোনা দ্বারা আংটি বানান। নবীজির দেখাদেখি অনেক সাহাবিও তেমন করেন। পরে যখন পুরুষের জন্য সোনা ব্যবহার করা নিষেধ হয়ে যায়, তখন রুপা দিয়ে একটি আংটি তৈরি করালেন। এতে আবিসিনীয় পাথর বসানো ছিল। ওই আংটির গায়ে আরবিতে খোদাই করে ওপরে ‘আল্লাহ’, মাঝখানে ‘রাসুল’ এবং নিচে ‘মুহাম্মদ’ লেখা ছিল, যা নিচ থেকে পড়লে দাঁড়ায় ‘মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ।’ (সুনান তিরমিজি: ১৭৪৭)
যেহেতু এই আংটি দলিল-দস্তাবেজ এবং রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্রে ব্যবহার হতো, তাই একই আকৃতির আংটি বানাতে তিনি অন্যদের নিষেধ করেন। বিভিন্ন বাদশাহর কাছে প্রেরিত রাসুলের (সা.) যেসব পত্র সংরক্ষিত আছে, সেগুলোতে তাঁর এই সিলমোহরটির ছাপ এখনো দেখতে পাওয়া যায়।
আংটিটি তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। রাসুলের (সা.) ওফাতের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত পরবর্তী দুজন খলিফা আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) এই আংটিটি ব্যবহার করেছিলেন। তাঁদের পর তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা.) প্রায় ছয় বছর আংটিটি ব্যবহার করেন। একদিন তাঁর হাত থেকে রাসুলের আংটি মদিনার 'আরিস' নামক কূপে পড়ে যায়। এরপর ওসমানের (রা.) নিয়োজিত কর্মচারীরা লাগাতার তিনদিন আংটিটি খোঁজাখুঁজি করেন। কূপের সব পানি তুলে ফেলা হয়; কিন্তু আংটিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। (বুখারি: ২/৮৭৩)
ঐতিহাসিকদের অনেকে মনে করেন, আংটিটি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ওসমানের (রা.) খেলাফতে অস্থিরতা দেখা দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ দানা বাঁধে। দীর্ঘসময় ধরে অশান্তি ও অস্থিরতা চলতে থাকে এবং একপর্যায়ে তিনি শহীদ হন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আংটি যে কূপে পড়ে গিয়েছিল, সেটি মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমে কুবা মসজিদ থেকে ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত। ১২ মিটার গভীর কূপটির নাম 'আরিস' হয়েছিল এক ইহুদি ব্যক্তির নাম অনুসারে। রাসুলের আংটি পড়ে যাওয়ার কারণে এই কূপের পানিকে কেউ কেউ বিশেষ বরকতময় মনে করেন।
হারিয়ে যাওয়ার পর রাসুলের (সা.) ঐতিহাসিক আংটি পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। বর্তমানে তুরস্কের একটি জাদুঘরে স্বর্ণের একটি আংটি সংরক্ষিত আছে, যার গায়ে রাসুলের সিলমোহরের অনুরূপ লেখা খোদাই করা আছে। অনেকে দাবি করেন এটি রাসুলের (সা.) আংটি; কিন্তু এ ব্যাপারে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ নেই। বরং এটি রাসুলের আংটি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও গবেষকদের মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নবীজির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন সংগ্রহশালার মধ্যে তুরস্কের সংগ্রহ বেশি নির্ভরযোগ্য, কিন্তু শক্তিশালী রেওয়াত অনুযায়ী রাসুলের (সা.) মোহরাঙ্কিত আংটিটি ছিল রুপার, স্বর্ণের নয়। পুরুষের স্বর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার আগে রাসুল (সা.) স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করেছেন, তবে সেটাতে তাঁর মোহর অঙ্কিত ছিল না।
লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।

