Logo

ধর্ম

রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করা অনুচিত

Icon

​মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১১

রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করা অনুচিত

​মানবজীবনের সবচেয়ে কোমল, সংবেদনশীল ও গঠনমূলক সময় হলো শৈশবকাল। এই সময়ে শিশুর মন, চিন্তা, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।

একজন শিশুকে কীভাবে লালন-পালন করা হচ্ছে এবং কীভাবে তাকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় তার ভবিষ্যৎ চরিত্র ও জীবনদর্শনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই ইসলাম শিশুদের প্রতি কোমলতা, দয়া ও সুবিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করা যে কতটা ক্ষতিকর ও নিন্দনীয়, তা আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।

​প্রখ্যাত বুজুর্গ ও ইসলামি চিন্তাবিদ হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রাহ.) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন—রাগের মাথায় কখনোই শিশুকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কারণ, রাগ এমন একটি আবেগ যা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এই অবস্থায় নেওয়া শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত প্রায়শই মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং তা অন্যায়ে পরিণত হয়।

​রাগের বশবর্তী শাস্তির ক্ষতিকর দিক

​রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করলে কয়েকটি মারাত্মক ক্ষতি ঘটে-

​শাস্তির মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীনতা: অভিভাবক বা শিক্ষক হয়তো একটি ছোট ভুলের জন্য শিশুকে শাসন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাগের বশে তা অতিরিক্ত মারধরে রূপ নিতে পারে। ফলে এটি ন্যায়সংগত শাস্তি না হয়ে জুলুমে পরিণত হয়।

​মানসিক বিপর্যয়: শিশুর মনে ভয়, আতঙ্ক, হীনম্মন্যতা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সে তার অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে সে হয় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, নয়তো অতিরিক্ত ভীতু ও আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়ে।

​ধর্মীয় গুনাহ: ইসলাম অন্যায়ভাবে কাউকে আঘাত করা বা কষ্ট দেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে দুর্বল ও অসহায়দের ওপর জুলুম করা আরও বড় অপরাধ।

​বান্দার হকের গুরুত্ব

​হজরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রাহ.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন—শিশুর ওপর জুলুম করা ‘বান্দার হক’-এর অন্তর্ভুক্ত। বান্দার হক এমন একটি বিষয়, যা কেবল তওবা দ্বারা মাফ হয় না; বরং যার হক নষ্ট হয়েছে, তার ক্ষমা প্রয়োজন হয়।

​এখানে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়। কারণ, যে শিশুর ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে নাবালেগ। শরিয়তের দৃষ্টিতে নাবালেগের ক্ষমা গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, সে যদি মুখেও বলে ‘আমি মাফ করে দিলাম’, তবুও তা শরিয়তের বিচারে যথেষ্ট নয়। ফলে এই অপরাধের ক্ষমা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে বোঝা যায়, রাগের বশে শিশুকে মারধর করা কত বড় ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়াবহ কাজ।

​শিক্ষক ও অভিভাবকের দায়িত্ব

​আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, শিশুকে মারধর না করলে সে শিখবে না। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক মনে করেন কঠোরতা ছাড়া শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণা ভুল ও ক্ষতিকর।

​হজরত থানবী (রাহ.) মাদরাসায় শিক্ষকদের জন্য একটি কঠোর নীতি নির্ধারণ করেছিলেন—কোনো ক্বারি বা শিক্ষক শিশুকে প্রহার করতে পারবেন না। যদি কেউ তা করেন, তবে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এমনকি তিনি এতটাই কঠোর ছিলেন যে, প্রয়োজনে শাস্তি হিসেবে ওই শিক্ষককে শিশুর দ্বারা প্রহার করানোর কথাও বলেছেন। এই ঘটনাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের প্রতি কোমলতা ও সহানুভূতির কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

​বিকল্প শাস্তির পদ্ধতি

​শিশুকে সংশোধন করার জন্য প্রহারই একমাত্র উপায় নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে খারাপ উপায়। হজরত থানবী (রাহ.) একটি সুন্দর বিকল্প পদ্ধতির কথা বলেছেন—শাস্তি হিসেবে ছুটি মওকুফ করা। অর্থাৎ, শিশুকে খেলাধুলা বা বিশ্রামের সময় থেকে কিছুটা বঞ্চিত করা। এই ধরনের শাস্তি শিশুর ওপর কার্যকর প্রভাব ফেলে, কিন্তু এতে তার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হয় না। বরং সে নিজের ভুল উপলব্ধি করতে শেখে এবং সংশোধনের সুযোগ পায়।

​এছাড়া আরও কিছু কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে:

১. ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা।

২. ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা।

৩. খারাপ আচরণের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা।

৪. ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিয়মিত দিকনির্দেশনা প্রদান।

​শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা দেওয়া একটি কঠিন কাজ—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা চঞ্চল, অস্থির এবং অনেক সময় অবাধ্য হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেই একজন অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রকৃত ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা হয়। রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় ইবাদত। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—রাগকে দমন করো, ক্ষমা করো এবং উত্তম আচরণ করো।

​ধর্মীয় দায়িত্ব

​শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণ কেবল একটি পারিবারিক বা সামাজিক বিষয় নয়; এটি একটি ধর্মীয় দায়িত্বও। রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করা শুধু একটি ভুল নয়; বরং এটি একটি গুরুতর অন্যায়, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হতে পারে।

​তাই আমাদের উচিত রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখা এবং শান্ত হওয়ার পর বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শিশুর মানসিক ও শারীরিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী দয়া ও মমতার মাধ্যমে তাদের গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের এই ছোট শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ নির্মাতা। তাদের হৃদয়ে যদি ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সম্মানের বীজ বপন করা যায়, তবে তারাই একদিন একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবে।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন