আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস
পৃথিবীর সৃষ্টি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ইসলাম
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৯
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস বা পৃথিবী দিবস ২০২৬; প্রতি বছর ২২ এপ্রিল এই দিবসটি পালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। বর্তমান পৃথিবী ভয়াবহ পরিবেশ সংকটে আক্রান্ত—তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ু ও পানিদূষণ, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানবসভ্যতাকে গভীর ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ইসলাম এ বিষয়ে শুধু নৈতিক শিক্ষা নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল কারণ
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান কারণগুলো হলো:
অতিরিক্ত শিল্পায়ন ও কার্বন নিঃসরণ।
বন উজাড় ও সবুজ প্রকৃতি ধ্বংস।
পানি ও বায়ু দূষণ।
অতিরিক্ত ভোগবাদ ও অপচয়।
প্রাকৃতিক সম্পদের অযথা ব্যবহার।
এসব কার্যক্রম শুধু প্রকৃতি নয়, মানবজীবনের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
পৃথিবীর বর্তমান পরিসংখ্যান
বিশ্ব জনসংখ্যা: প্রায় ৮,১০০ মিলিয়ন (৮১০ কোটি) মানুষ।
বন ধ্বংস: প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) হেক্টর বন হারিয়ে যাচ্ছে।
বায়ুদূষণজনিত মৃত্যু: বছরে প্রায় ৭ মিলিয়ন (৭০ লক্ষ) মানুষ।
নিরাপদ পানির সংকট: প্রায় ২,২০০ মিলিয়ন (২২০ কোটি) মানুষ।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গত শতকে প্রায় ১.১°C বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংখ্যা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।
কোরআনের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ
বিপর্যয় মানুষের কৃতকর্মের ফল:
আল্লাহ তাআলা বলেন— “স্থল ও সমুদ্রে মানুষের কৃতকর্মের কারণে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে।” — (সূরা আর-রূম: ৪১)। শিক্ষা: পরিবেশ বিপর্যয় মানুষেরই ভুল ব্যবস্থাপনার ফল।
পৃথিবীতে ফাসাদ নিষিদ্ধ
“তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, যখন তা সংশোধন করা হয়েছে।” — (সূরা আল-আরাফ: ৫৬)। শিক্ষা: প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
পৃথিবীর বয়স ও সৃষ্টি (বৈজ্ঞানিক তথ্য)
বিজ্ঞান অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪,৫৪০ মিলিয়ন বছর (৪৫৪ কোটি বছর)। এটি নির্ধারণ করা হয়েছে রেডিওমেট্রিক ডেটিং, উল্কাপিণ্ড ও শিলা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা দেয়নি, তবে সৃষ্টি সম্পর্কে বলে— “তিনি আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন।” — (সূরা আল-আরাফ: ৫৪)। এখানে “ছয় দিন” সময়ের ধাপ বা পর্যায় বোঝায়, মানবীয় ২৪ ঘণ্টা নয়।
মানবজাতির সৃষ্টি ও বৈচিত্র্য
কোরআনের নীতি: “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।” — (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
শিক্ষা: ১. মানবজাতির উৎস এক।
২. জাতি ও ভাষা কেবল পরিচয়ের জন্য।
৩. শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে।
মানবজাতির একত্ব (হাদিস): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “তোমরা সবাই আদমের সন্তান, আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি।” (জামে তিরমিজি: ৩৯৫৫)। শিক্ষা: বর্ণবাদ ইসলামে নিষিদ্ধ, সকল মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী।
পৃথিবীতে সৃষ্টিজগতের শ্রেণিবিন্যাস
কোরআনের আলোকে তিন ধরনের প্রধান চেতন সৃষ্টিজীব রয়েছে:
১. মানুষ: “আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।” — (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)। বৈশিষ্ট্য: বিবেকসম্পন্ন, দায়িত্বশীল, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
২. জিন: “আমি জিনকে সৃষ্টি করেছি আগুনের শিখা থেকে।” — (সূরা আর-রহমান: ১৫)। বৈশিষ্ট্য: অদৃশ্য, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন।
৩. ফেরেশতা: “তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না, যা নির্দেশ দেওয়া হয় তাই করে।” — (সূরা আত-তাহরীম: ৬)। বৈশিষ্ট্য: পাপমুক্ত, নূর থেকে সৃষ্ট, সম্পূর্ণ আনুগত্যশীল।
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ভারসাম্য
“পৃথিবীতে যত প্রাণী ও পাখি আছে, তারা তোমাদের মতোই এক একটি জাতি।” — (সূরা আল-আনআম: ৩৮)। শিক্ষা: প্রাণী ও পাখিরাও আল্লাহর সৃষ্টি, পরিবেশের ভারসাম্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবেশ বিষয়ে হাদিসের দৃষ্টিকোণ
১. গাছ রোপণ: “যদি কিয়ামত শুরু হওয়ার সময়ও তোমাদের হাতে চারা থাকে, তবে তা রোপণ করো।” — (সহিহ বুখারি: ৬০২৩)।
২. সদকা হিসেবে বৃক্ষরোপণ: “গাছ রোপণ করলে তা থেকে মানুষ ও প্রাণী যা খায় তা সদকা।” — (সহিহ বুখারি: ২৩২০)।
৩. পানির অপচয় নিষেধ: “তুমি অপচয় করো না, এমনকি নদীর পাশে থাকলেও।” — (ইবনে মাজাহ: ৪২৫)।
৪. প্রাণীর অধিকার: এক নারী একটি বিড়ালকে আটকে রেখে কষ্ট দেওয়ার কারণে শাস্তি পেয়েছে। — (সহিহ বুখারি: ৩৩১৮)।
৫. দায়িত্ব ও জবাবদিহি: “প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” — (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)।
ইসলাম ও বিজ্ঞান: সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
বিজ্ঞান বলে: পৃথিবীর বয়স বিলিয়ন বছর, মানুষ এক প্রজাতি এবং জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত বিস্তৃত।
ইসলাম বলে: সবকিছু আল্লাহর পরিকল্পিত সৃষ্টি, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) এবং প্রকৃতি একটি আমানত।
উভয়ের মূল বার্তা: ভারসাম্য, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব।
উপসংহার
পরিশেষে বলতে চাই, পৃথিবী, মানবজাতি ও সমগ্র সৃষ্টিজগত আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন। কোরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়— পৃথিবী ধ্বংসের বস্তু নয়, বরং একটি আমানত। পরিবেশ রক্ষা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে সমাধান খুঁজছে, ইসলাম বহু আগেই সেখানে পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তাই এখনই সময় পৃথিবীকে রক্ষা করার, কারণ পৃথিবীকে রক্ষা করা মানেই মানবতাকে রক্ষা করা।
লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।
ইমেইল: drmazed96@gmail.com

