মুসলিম মিল্লাতের বড় দুই আনন্দের দিনের মধ্যে ঈদুল আজহা একটি। ঈদুল আজহার প্রধান আকর্ষণ ও বড় আমল হলো কোরবানি করা। কোরবানি হলো ইসলামের একটি শিয়ার বা মহান নিদর্শন।
আমাদের সমাজে অনেকেই যৌথভাবে বা শরিকানায় কোরবানি দিয়ে থাকেন। ইসলামি শরিয়তে বড় পশুর ক্ষেত্রে (যেমন: উট, গরু, মহিষ) সর্বোচ্চ সাত ভাগে কোরবানি দেওয়া বৈধ করা হয়েছে।
তবে যৌথ কোরবানির ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে; কারণ এসব বিষয়ে সামান্য ত্রুটি বা অসচেতনতা পুরো কোরবানির বিশুদ্ধতা নষ্ট করে দিতে পারে।
১. অংশীদার বা শরিকের সংখ্যা: বড় পশুর ক্ষেত্রে অংশীদার সর্বোচ্চ সাতজন হতে পারবে। সাত বা তার কম যেকোনো সংখ্যা (যেমন: তিন, চার বা পাঁচ ভাগ) হতে পারে; তবে কোনো অবস্থাতেই সাতজনের বেশি শরিক হওয়া যাবে না। সাতের অধিক শরিক হলে কারো কোরবানিই সহিহ হবে না।
হযরত জাবির (রা.) বলেন, হুদাইবিয়ার বছর আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে একটি উটে সাতজন এবং একটি গরুতে সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি করেছিলাম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
২. নিয়তের একনিষ্ঠতা (ইখলাস): কোরবানির মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। প্রত্যেক অংশীদারকেই খাঁটি নিয়তে ও একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করতে হবে। শরিকদের মধ্যে যদি কোনো একজনেরও নিয়ত কেবল গোশত খাওয়া বা লোকদেখানো হয়, তবে শরিকদের কারো কোরবানিই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। (আল-বিনায়া: ১২/৪৮)
৩. হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা: কোরবানির পশুর জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থ সম্পূর্ণ হালাল হতে হবে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ তাই প্রকাশ্য হারাম উপার্জনে লিপ্ত কোনো ব্যক্তিকে কোরবানির শরিকানাভুক্ত করা থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, কোনো শরিকের টাকা সম্পূর্ণ হারাম, তবে তার কারণে অন্য সবার কোরবানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৪. শরিকানার সঠিক বণ্টন: বড় পশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতটি ভাগ হতে পারে। এর চেয়ে বেশি ভাগে অংশ নেওয়া কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাগে একাধিক ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা শরিয়তসম্মত নয়। অর্থাৎ, একটি ভাগে কেবল একজন ব্যক্তিই অংশ নিতে পারবেন, একাধিক নয়। (রদ্দুল মুহতার)
৫. গোশত বণ্টনে সতর্কতা: কোরবানির গোশত বণ্টন করাও একটি ইবাদত। যৌথ কোরবানির ক্ষেত্রে গোশত অনুমান করে ভাগ করা যাবে না। পাল্লা দিয়ে মেপে সম্পূর্ণ নিখুঁত ও সমানভাবে বণ্টন করতে হবে। অনুমানের ভিত্তিতে বণ্টন করলে কম-বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা কোরবানির পুণ্য ও শুদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া)
৬. কসাই বা শ্রমিকদের পারিশ্রমিক: কোরবানির ক্ষেত্রে আরও একটি জরুরি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, তা হলো, কসাই বা শ্রমিকদের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া বা অন্য কোনো অংশ দেওয়া যাবে না। পারিশ্রমিক দিতে হবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে, নগদ অর্থে। অবশ্য পারিশ্রমিক পরিশোধের পর কসাইকে উপহার বা হাদিয়া হিসেবে গোশত দেওয়াতে কোনো বাধা নেই।
হযরত আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন কসাইকে কোরবানির পশু থেকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোনো কিছু না দিই। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
একাকী কিংবা যৌথকোরবানির প্রতিটি পদক্ষেপকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত মনে করতে হবে। শরিয়তের নির্দেশিত পদ্ধতি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করলেই আমাদের এই ত্যাগ সার্থক হবে।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার কোরবানিকে তাকওয়ার রঙে রাঙিয়ে কবুল করুন এবং আমাদের অন্তরে ইব্রাহিমী ত্যাগের প্রকৃত মহিমা জাগ্রত করে দিন। আমিন।
-মিসবাহ বিন জাকারিয়া (মুফতি ও মুহাদ্দিস জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা,ঢাকা)
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

