# এবারও ভোগাবে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ
পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার (৮ জিলহজ) সকাল থেকে। মিনায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু করবেন বিশ্বের লাখো মুসল্লি। হাজিদের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সৌদি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আজ রোববার রাত থেকেই মিনার উদ্দেশে রওয়ানা হন হজযাত্রীরা।
রোববার (২৪ মে) ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশি হাজিদের মিনায় পাঠাতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মক্কাস্থ বাংলাদেশ হজ অফিস ও সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সিগুলো।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ৮ জিলহজ হাজিরা মিনায় অবস্থান করে ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন। মিনায় রাত্রিযাপনের পর আগামীকাল ৯ জিলহজ (মঙ্গলবার) সকালে তারা আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন।
আরাফাতের খুতবা শেষে হাজিরা একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করবেন। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, আরাফাতে অবস্থান করাই হজের মূল রুকন।
সূর্যাস্তের পর হাজীরা মুজদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় শেষে উন্মুক্ত আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করবেন তারা। পরদিন ১০ জিলহজ ফজরের আগে মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরে বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন হাজিরা। এরপর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় পশু কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার আনুষ্ঠানিকতা পালন করবেন।
১১ ও ১২ জিলহজ হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই মিনা ত্যাগ করবেন হাজীরা।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ মুসলমান হজ পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর প্রায় সাড়ে ৭৮ হাজার মুসল্লি হজে অংশ নিয়েছেন।
এবারও ভোগাবে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ: এদিকে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও হজের সময় প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মিনা ও মুজদালিফায় তাপমাত্রা বাড়ছে বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মিনা ও মুজদালিফা উভয় স্থানেই তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে এবং বাতাসের গতি সীমিত থাকলে দুপুরের দিকে তা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এজন্য হজযাত্রীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বিশেষভাবে সতর্ক করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। শনিবার (২৩ মে) মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হজের গুরুত্বপূর্ণ দুই স্থান মিনা ও মুজদালিফায় বর্তমানে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। বাতাসের গতি কমে গেলে দুপুরের দিকে তা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি সরকার সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুতি জোরদার এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত গরমের সময় বাইরে না যাওয়া এবং প্রয়োজন ছাড়া তাঁবুর বাইরে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হজযাত্রীদের ছাতা ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক সব নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন কঠোরভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হজের পাঁচ দিনের ধারাবাহিক আমল: মিনায় মুসল্লিদের জড়ো হওয়ার মধ্য দিয়ে পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ৮ জিলহজ সকাল থেকে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও রাতেই হাজিরা মিনার তাঁবুতে পৌঁছে যান।
হজযাত্রীর সংখ্যা বিবেচনায় সৌদি মুয়াল্লিমরা আগের রাত থেকেই হজযাত্রীদের তাঁবুর শহর মিনায় নেওয়া শুরু করেন। হজযাত্রীরা এশার পর থেকে মক্কার নিজ নিজ আবাসন থেকে ইহরাম বেঁধে মিনায় রওয়ানা হন। ৯ জিলহজ পালিত হবে পবিত্র হজ। এদিন আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হবেন হজপালনকারী আল্লাহর মেহমানরা।
৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত চলবে হজের কার্যক্রম। হজের ৫ দিনের করণীয়গুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো-
৮ জিলহজ: হজের ইহরাম: মক্কার হারাম শরিফ বা বাসা/হোটেল থেকে হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া এবং জোহরের নামাজের আগেই মিনায় পৌঁছা।
মিনায় অবস্থান: মিনায় ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব এবং সেখানে অবস্থান করা সুন্নাত।
৯ জিলহজ: আরাফাতের ময়দানে অবস্থান: ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার মাধ্যমে পালিত হবে পবিত্র হজ। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আরাফাই হজ্জ’। তাই ৯ জিলহজ ফজরের পর সম্ভব হলে মিনায় গোসল করে নেবে অথবা ওজু করে সকাল সকাল আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।
৯ জিলহজ জোহরের আগেই হজের অন্যতম রোকন পালনে আরাফাতের ময়দানে গিয়ে উপস্থিত হওয়া এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তথায় অবস্থান করা। আর এটাই হলো হজের অন্যতম রোকন। ৯ জিলহজ সকালে মিনা থেকে রওয়ানা সময় তাকবির বলা-‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে হজের খুতবা শোনা এবং নিজ নিজ তাবুতে জোহর ও আসরের নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে আলাদাভাবে আদায় করা। তাওবা-ইসতেগফার, তাকবির, তাসবিহ, তাহলিল ও রোনাজারিতে আত্মনিয়োগ করা। বিশেষ করে, হজের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তা বুঝে নিয়ে জীবনের বাকি সময় এ নসিহতের আলোকে জীবন গড়ার দীপ্ত শপথ নেওয়া।
সন্ধ্যায় মাগরিব না পড়ে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও ইশার নামাজ এক আজানে আলাদা আলাদা ইক্বামতে একসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আদায় করা।
১০ জিলহজ: মুজদালিফায় অবস্থান: মুজদালিফায় সারারাত খোলা আকাশের নিচে মরুভূমির বালুর ওপর অবস্থান করা। মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্য উঠার আগে কিছু সময় অবস্থান করা এবং সূর্য উঠার আগেই মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।
পাথর সংগ্রহ: মিনায় জামরাতে (শয়তানকে মারার জন্য) মুজদালিফায় অবস্থানের সময় রাতে কিংবা সকালে কংকর সংগ্রহ করা।
কংকর নিক্ষেপ : ১০ জিলহজ সকালে মুজদালিফা থেকে মিনায় এসেই বড় জামরাতে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করা। আর তা জোহরের আগেই সম্পন্ন করা। কংকর নিক্ষেপের স্থানগুলোতে বাংলায় দেওয়া দিক-নির্দেশনা মনোযোগ সহকারে শুনে তা আদায় করা।
দমে শোকর: বড় জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করেই মিনায় কুরবানির পশু জবাই করা। এ ক্ষেত্রে যারা ব্যাংকের মাধ্যমে কুরবানি সম্পন্ন করবেন, তারা ব্যাংকের লোকদের কাছ থেকে মাথা ন্যাড়া বা হলক করার নিদির্ষ সময় জেনে নেয়া।
মাথা মুণ্ডন করা: কুরবানির পর পরই মাথা ন্যাড়া করার মাধ্যমে হজের ইহরাম থেকে হালাল হবে হাজি। মাথা মুণ্ডনের মাধ্যমে হাজি ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করাসহ সব সাধারণ কাজ করতে পারলেও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে।
তাওয়াফে জিয়ারত: হজের সর্বশেষ রোকন হলো তাওয়াফে জিয়ারত। যা ১১ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ১২ জিলহজ সূর্য ডোবার আগে তাওয়াফে জিয়ারত না করতে পারলে দম বা কুরবানি কাফফারা আদায় করতে হবে।
কংকর নিক্ষেপ: ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন মিনায় অবস্থান করবে এবং ধারাবাহিকভাবে ছোট, মধ্যম ও বড় জামরাতে ৭টি করে ২১টি কংকর নিক্ষেপ করবে। তবে যদি কেউ কংকর নিক্ষেপের আগে কিংবা পরে কাবা শরিফ গিয়ে তাওয়াফে জিয়ারত আদায় করে তবে তাকে তাওয়াফের পর আবার মদিনায় চলে আসতে হবে এবং মিনায় অবস্থান করতে হবে।
মিনায় রাতযাপন ও ত্যাগ: ১০ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত মিনাতেই রাত যাপন করা এবং যারা মিনা ত্যাগ করবেন তারা ১২ তারিখ সূর্য ডোবার আগেই মিনা ত্যাগ করবে। সূর্য ডোবার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে সে রাত (১৩ জিলহজ) মিনায় অবস্থান করা।
উল্লেখ্য যে, যদি কেউ ১২ জিলহজ সূর্য ডোবার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারে কিংবা থাকার ইচ্ছা করে তাকে ১৩ জিলহজ ৭টি করে আরও ২১টি কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১৩ জিলহজও মিনায় অবস্থান করেছিলেন।
বিদায়ী তাওয়াফ: সারাবিশ্ব থেকে আগত সব হজপালনকারীর জন্য দেশে রওয়ানা হওয়ার আগে তাওয়াফ করা আবশ্যক। এ তাওয়াফকে বিদায়ী তাওয়াফ বলে। তবে জিলহজ মাসের ১২ তারিখের পর যে কোনো নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফে হিসেবে আদায় হয়ে যায়।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

