ঈদের আনন্দ শুধু নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কখনো কখনো ভ্রমণের ডানায় ভর করেও সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়ের গভীরে। আর সে ভ্রমণ যদি হয় প্রিয়জনদের সান্নিধ্য, আলেম-উলামাদের সাক্ষাৎ, ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির নিদর্শন অবলোকনের উপলক্ষ, তাহলে তার আনন্দ ও তাৎপর্য আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— "তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো তিনি কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছেন।" —(সূরা আল-আনকাবুত: ২০)
এই আয়াতের আলোকে ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়; বরং তা শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও আত্মিক সমৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
২০২৬ সালের ২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার। ঈদুল ফিতরের পাঁচ দিন পর এমনই এক আনন্দঘন সফরে বের হয়েছিলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে।
দুপুরের খাবার শেষে গাড়িতে চেপে বসলাম। সামনে দীর্ঘ পথ, আর হৃদয়ে নতুন স্থান দেখার অদম্য আগ্রহ। বিকেলের আলো যখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছিল, তখন আউশকান্দির একটি মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করলাম। পথ চলতে চলতে সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তে পৌঁছে গেলাম সিলেটের হুমায়ুন চত্বরের নিকটবর্তী এলাকায়। সেখানকার একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে হাজির হলাম সিলেটের সুপরিচিত ‘পিচ্চির দোকান’-এ। হালকা নাশতা ও কফি পান শেষে পাশের মসজিদে এশার নামাজ আদায় করলাম।
এ সময় ফোন করলেন ছোট ভাই কারী মাওলানা ইহসান বিন সিদ্দিক। তাঁর আন্তরিক অনুরোধে রওয়ানা দিলাম আঞ্জুমানে তা'লীমুল কুরআন বাংলাদেশের দিকে। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই জিয়ারত করলাম প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদে মুহতারাম কারী মাওলানা আলী আকবর সিদ্দিক রহ.-এর কবর। নীরব পরিবেশে দাঁড়িয়ে তাঁর ইলমি খেদমত ও কুরআনের জন্য নিবেদিত জীবনের কথা মনে পড়ে গেল।
কবর জিয়ারত মানুষকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— "তোমরা কবর জিয়ারত করো; কারণ তা তোমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।" —(সহিহ মুসলিম)
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনুভব করছিলাম—মানুষের প্রকৃত সাফল্য ধন-সম্পদ বা খ্যাতিতে নয়; বরং ইলম, আমল এবং দ্বীনের খেদমতের মধ্যেই নিহিত। একজন আলেমের ইখলাসপূর্ণ জীবন ও কর্ম মৃত্যুর পরও মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে। এরপর অফিসে গিয়ে সাক্ষাৎ হলো আমার প্রিয় উস্তাদ এবং আঞ্জুমানের সাধারণ সম্পাদক কারী মাওলানা ইমদাদুল হকের সঙ্গে। বিভিন্ন বিষয়ে কিছুক্ষণ প্রাণবন্ত আলোচনা হলো। বিদায়ের সময় তিনি সৌজন্য উপহার হিসেবে ‘দাওয়াতুল কুরআন’ ম্যাগাজিনটি তুলে দিলেন।
এরপর দেখা হলো প্রিয় ভাই ও বন্ধু মাওলানা হুসাইন আহমদ কামালের সঙ্গে। মূলত তাঁর দাওয়াতেই এ সফরের আয়োজন। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন উপশহরে তাঁর বাসায়। সেখানকার আন্তরিক আতিথেয়তা ও আরামদায়ক পরিবেশে কাটল রাতের বিশ্রাম।
পরদিন ২৭ মার্চ, শুক্রবার। সকালের নির্মল আলো যেন নতুন উদ্যমে পথচলার আহ্বান জানাচ্ছিল। প্রাইভেট কারে আমাদের গন্তব্য ঐতিহাসিক কৌড়িয়া মাদরাসা। সঙ্গে ছিলেন হুসাইন কামাল ভাইয়ের প্রিয় ছাত্র সাবের আহমদ সাব্বির। পথের দু’পাশে বিস্তৃত সবুজ প্রকৃতি, গ্রামবাংলার শান্ত সৌন্দর্য এবং স্নিগ্ধ বাতাস ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে।
দুপুর বারোটার দিকে পৌঁছে গেলাম কৌড়িয়া মাদরাসায়। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ মাওলানা আব্দুল করিম কৌড়িয়া রহ. প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও তাঁর স্মৃতি ও অবদানের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে। প্রথমে তাঁর কবর জিয়ারত করলাম, এরপর ঘুরে দেখলাম পুরো মাদরাসা। দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী প্রতিটি ভবন ও প্রাঙ্গণ যেন অতীতের গৌরবগাথা নীরবে শুনিয়ে যাচ্ছিল।
প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কত আলেম, কত ছাত্র, কত ইলমি খেদমতের ইতিহাস লুকিয়ে আছে এ প্রাঙ্গণে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— "যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।" —(সহিহ মুসলিম)
বাংলাদেশের দ্বীনি শিক্ষা ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য।
অফিস কক্ষে কিছু সময় কাটিয়ে জুমার নামাজ আদায় করলাম। ফেরার পথে সিলেটের বিখ্যাত ‘পাঁচ ভাই হোটেল’-এ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হলো। আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন হুসাইন কামাল ভাইয়ের মামা আব্দুর রাজ্জাক ডালিম এবং ছাত্র আলী আমজাদ। ড্রাইভারসহ আমরা ছয়জন মিলে আনন্দঘন পরিবেশে খাবার গ্রহণ করলাম। সুস্বাদু খাবারের স্বাদ ও আন্তরিক সঙ্গ সফরের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিল।
খাবার শেষে যাত্রা করলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সংক্ষেপে শাবিপ্রবি। বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস, আধুনিক স্থাপনা এবং প্রাণবন্ত শিক্ষাঙ্গন দেখে সত্যিই মুগ্ধ হলাম। হুসাইন কামাল ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে দেখালেন। স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্য কয়েকটি ছবিও তোলা হলো।
এ সময় ফোন এল গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ দারুল উলুম হুসাইনিয়া মাদরাসা থেকে। কল করেছিলেন মাদরাসার মুহতামিম এবং আমার সাবেক সহকর্মী মুফতি খাইরুল আমিন মাহমুদী। তাঁর আন্তরিক আহ্বানে আমরা রওয়ানা দিলাম ঢাকাদক্ষিণের উদ্দেশ্যে।
মাদরাসায় পৌঁছে আসরের নামাজ আদায় করলাম। এরপর অফিস কক্ষে গিয়ে দেখা হলো মুফতি খাইরুল আমিন মাহমুদীর সঙ্গে। দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ হওয়ায় কথার ঝুলি যেন শেষই হতে চাইছিল না। সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয়ে গেল আরেক প্রিয় সহকর্মী, মাদরাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল্লাহ মাসরুর আকুনীর সঙ্গে। পুরোনো দিনের স্মৃতি, বর্তমানের ব্যস্ততা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ প্রাণখোলা আলাপ হলো। নাশতা শেষে মাগরিবের নামাজ আদায় করে বিদায় নিলাম।
এরপর গন্তব্য হলো ঢাকাউত্তরে অবস্থিত হুসাইন কামাল ভাইয়ের কর্মস্থল জামিয়া হুসাইনিয়া। সেখানে মুহতামিম বা হাফেজ ফয়েজ আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হলো। কিছুক্ষণ আলাপচারিতা ও হালকা নাশতার পর সেখান থেকেও বিদায় নিলাম।
রাত নেমে এসেছে। হুসাইন কামাল ভাইয়ের ইমামতিতে তাঁর বাড়ির পাশের মসজিদে এশার নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে তাঁর বাসায় গেলে আবারও আন্তরিক আপ্যায়নের মুখোমুখি হতে হলো। যদিও আর খাবারের ইচ্ছা ছিল না, তবুও ভালোবাসার টানে সামান্য নাশতা গ্রহণ করলাম। সেখানে পরিচয় হলো তাঁর ছোট্ট মেয়ে রুহামা হুসাইন এবং দুই ছেলে মমশাদ হুসাইন ও হাম্মাদ হুসাইনের সঙ্গে। শিশুদের সরলতা, প্রাণচাঞ্চল্য ও নির্মল হাসি মুহূর্তেই মনকে সজীব করে তুলল।
রাতের শেষ প্রহরে ফিরে এলাম উপশহরের বাসায়। নিস্তব্ধ রাতের আবহে আমার দৃষ্টি গিয়ে থামল হুসাইন কামাল ভাইয়ের বুকশেলফে। বইয়ের প্রতি আমার দুর্বলতা বহুদিনের। লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় বই আমার নিত্যসঙ্গী। তাই আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। একের পর এক বই হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম। তাঁর সমৃদ্ধ সংগ্রহ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। বিশেষ করে সিলেটের খ্যাতিমান লেখক সৈয়দ মবনুরের কয়েকটি বইয়ের অংশবিশেষ পড়ে বেশ আনন্দ পেলাম। বইয়ের সুবাস, নীরব রাত এবং জ্ঞানের জগতে বিচরণ—সব মিলিয়ে রাতটি হয়ে উঠল অনন্য স্মরণীয়।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা নাশতা সেরে শুরু হলো ফেরার যাত্রা। প্রিয় সাব্বির এক বোতল পানিসহ আমাকে গাড়িতে তুলে দিল। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আপন ঠিকানার দিকে। পেছনে পড়ে রইল সিলেটের পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য, আলেম-উলামাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অগণিত স্মৃতি।
সফরের পুরো সময়জুড়ে বারবার মনে হয়েছে, আল্লাহ তাআলার অগণিত নিয়ামতের মধ্যে ভ্রমণও একটি বিশেষ নিয়ামত। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং জ্ঞানী-গুণী মানুষের সান্নিধ্য মানুষের অন্তরকে প্রশস্ত করে, চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে এবং জীবনের লক্ষ্যকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
এই সংক্ষিপ্ত সফর কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; ছিল আত্মার প্রশান্তি অর্জনের এক উপলক্ষ, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির নিদর্শন অবলোকনের এক সুযোগ, প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলনের এক আনন্দঘন মুহূর্ত এবং ইলম ও আমলের পথে নতুন প্রেরণা সঞ্চয়ের এক স্মরণীয় অধ্যায়। সিলেটের সবুজ প্রকৃতি, আলেম-উলামাদের সান্নিধ্য, ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং আন্তরিক মানুষের ভালোবাসা আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে।
ভ্রমণের শেষ মুহূর্তে মনে পড়ছিল আল্লাহ তাআলার সেই বাণী— "নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" —(সূরা আলে ইমরান: ১৯০)
আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন এই সফরকে কবুল করেন, এর মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষা ও প্রেরণাকে আমাদের জীবনে কল্যাণের কারণ বানান এবং ভবিষ্যতেও দ্বীন, ইলম ও সৎকর্মের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন। ঈদের পর সিলেট ভ্রমণের এই স্মৃতিময় দিনগুলো তাই শুধু আনন্দের স্মৃতি নয়; বরং ঈমানি অনুভূতি, জ্ঞানচর্চা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য অধ্যায় হয়ে দীর্ঘদিন হৃদয়ের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে।
লেখক: সম্পাদক, প্রতিভা

