Logo

ধর্ম

নারী অধিকার ও ইসলাম

Icon

আবু মুয়াজ সাখাওয়াত হোসাইন

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:২৬

নারী অধিকার ও ইসলাম

ইসলামপূর্ব যুগে নারী ছিল চরম অবহেলিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং অধিকারহারা এক সমাজচ্যুত জাতি। তৎকালীন সময়ে নারীকে মানবসমাজের কোনো অংশই মনে করা হতো না, বরং তারা ছিল কেবলই পুরুষের ভোগ-বিলাসের পণ্য এবং দাসত্বের নিগড়ে বাঁধা এক করুণ চরিত্র।

নারীদের মানুষ হিসেবে কোনো যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হতো না এবং তাদের ন্যূনতম কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক বা আইনি অধিকার স্বীকৃত ছিল না। এমনকি মানবজাতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সমাজে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকুও তাদের ছিল না। কন্যাসন্তানের জন্ম নেওয়াকে তৎকালীন সমাজ চরম অবমাননাকর ও মানহানিকর মনে করত। এই পঙ্কিল মানসিকতার কারণে নিষ্পাপ কন্যাসন্তানদেরকে অত্যন্ত নির্মমভাবে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো! জাহেলি যুগের এমন বিবেকবর্জিত, বর্বর ও অমানুষিক কর্ম সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন: ​"আর যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?" (সূরা তাকভীর: ৮-৯)

​সে যুগে নারীদের স্ত্রীর অধিকার, মোহরানা এবং তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা হতো। পুরুষরা নারীদের সাথে পশুর মতো আচরণ করত। তাদেরকে যখন-তখন তালাক দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং অন্যত্র স্বামী গ্রহণের স্বাধীনতা বা অবকাশও দেওয়া হতো না। যুগের পর যুগ ধরে নারী জাতির ওপর এই জাতীয় অমানবিক ও অমানুষিক জুলুম-অत्याচার চালানো হচ্ছিল।

​মানবতার এই চরম অধঃপতনের ভয়ানক দুর্দিনে, অন্ধকার চিরে আবির্ভূত হলো এক নতুন আলোকবর্তিকা, এক অনন্য সভ্যতা! শুরু হলো এক মহা ইনকিলাব বা মহান বিপ্লব! বলা যায়, এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসে নারী জাতির অবদমিত ভাগ্যের আকাশে একটি নতুন দিগন্তের অভ্যুদয়; বরং একটি ঐশী নির্দেশনা, একটি মুক্তির পথ এবং এক বরকতময় যুগের সূচনা। এই বিপ্লব ছিল মানুষের চরিত্র, সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে পরিবার ও দাম্পত্য জীবনের সকল স্তরে শুচিতা, ন্যায়বিচার ও পরিশুদ্ধতা প্রতিষ্ঠার মহাবিপ্লব। আর এই বরকতময় বিপ্লবের পরশ লেগেছিল পৃথিবীর প্রতিটি কোণায়! সেই আলোর দিশারী সভ্যতা ও বৈপ্লবিক জীবনব্যবস্থা হলো পবিত্র আল-কুরআন ও মহান ধর্ম ইসলাম।

​ইসলামের এই চিরন্তন মানবিক উপহার তৎকালীন ও পরবর্তী সময়ের সে সব ধর্মের ভ্রান্ত মতবাদ ও দর্শনকে অসার ও মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পেরেছে, যারা মনে করত—‘নারীর ন্যায় এত পাপ-পঙ্কিলতাময় প্রাণী জগতে আর নেই। নারী প্রজ্জ্বলিত অগ্নিস্বরূপ। সে ক্ষুরের ধারালো দিক। এই সমস্তই তার দেহে সন্নিবিষ্ট’। নারীদের প্রতি চরম ঘৃণাভরে গ্রিক ও রোমান সভ্যতার যেসব দার্শনিকেরা বলেছিল, "Men should not love them" অর্থাৎ ‘নারীদের ভালোবাসানো পুরুষদের উচিত নয়’।

​ইসলামের এই সাম্য ও মানবতার বাণী সে সব দেশে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল, যেখানে বিধবা নারীদেরকে জোরপূর্বক কিংবা সামাজিক চাপে স্বামীর জলন্ত চিতায় অবলীলায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হতো (সতীদাহ প্রথা)! ইসলাম সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত করেছে ইতিহাসের সে সব প্রাচীন সভ্যতাকে, যেখানে বিশ্বাস করা হতো—‘মানব সমাজে নারীদের স্থান সর্বনিম্নে। অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস! নারী সর্বাপেক্ষা হতভাগ্য প্রাণী। জগতে নারীর মতো নিকৃষ্ট আর কিছু নেই’। ইসলাম এই অন্ধকার বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে নারীর প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছে।

নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ইসলামের ভূমিকা:

​ইসলাম যেভাবে নারীর সামগ্রিক অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে, ইসলামের আগে পৃথিবীর বুকে কোনো ধর্ম, রাষ্ট্রীয় আইন বা আধুনিক সভ্যতাও এভাবে নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারেনি। ইসলাম ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এক অভিনব বৈপ্লবিক আদর্শ ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা স্থাপন করেছেন। মানবমন ও মানবসমাজে নারী প্রগতির প্রকৃত গোড়াপত্তন করে তিনি এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।

​ইসলামে নারীর স্বাধীন মত প্রকাশের মৌলিক বাক-স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সৃষ্টির সেরা জীব বা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমান আত্মিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং উভয়ই সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের সম-অধিকার রাখেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ​"আর যে মুমিন পুরুষ অথবা নারী সৎকর্ম করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাদেরকে বেহিসাব রিজিক দেওয়া হবে।" (সূরা আল-মু’মিন: ৪০)

​ইসলামের কষ্টিপাথরে নারী-পুরুষের মর্যাদা তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে শুধু পুরুষের সমমর্যাদাই দেয়নি, বরং জীবনের প্রধান প্রধান ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে পুরুষ থেকে নারীকে অনেক বেশি সম্মান ও মর্যাদার উচ্চাসনে বসিয়েছে।

​মা হিসেবে নারীর মর্যাদা: সন্তান লালন-পালন ও ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ইসলাম একজন নারীকে একজন পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ও মর্যাদার অধিকারী করেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বর্ণনা করেন—একবার এক লোক মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকারী কে?" নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার মা।" ওই লোক জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" তিনি উত্তর দিলেন, "তোমার মা।" ওই লোক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" এবারও তিনি উত্তর দিলেন, "তোমার মা।" লোকটি বললেন, "তারপর কে?" নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, "তোমার পিতা।" (বুখারি: ৫৯৭১, মুসলিম: ২৫৪৮)। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, "মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।"

​কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা: জাহেলি যুগে যেখানে কন্যাসন্তানকে অভিশাপ মনে করা হতো, সেখানে ইসলাম কন্যা সন্তানকে জান্নাতের চাবিকাঠি ও রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—"যার তিনটি মেয়ে থাকে কিংবা তিনটি বোন থাকে, অথবা দুটি মেয়ে বা দুটি বোন থাকে; সে যদি তাদের সাথে সবসময় সদয় ব্যবহার করে এবং তাদের লালন-পালন ও অধিকারের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করে, তবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত।" (তিরমিযী: ১৯২২)

​স্ত্রী হিসেবে নারীর মর্যাদা: ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবনে নারী-পুরুষ কেউ কারও অধীনস্ত দাস নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক ও পরম বন্ধু। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত শৈল্পিক ভাষায় বলা হয়েছে, "তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।" (সূরা বাকারা: ১৮৭)। অর্থাৎ, পোশাক যেভাবে মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং লজ্জা ও আবহাওয়া থেকে রক্ষা করে, স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের সম্মান ও গোপনীয়তার তেমনই রক্ষক। কুরআনে আরও কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, "তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সৎ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে জীবন যাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও নারীদের অধিকার ও তাদের প্রতি সদয় আচরণের ব্যাপারে উম্মতকে বিশেষ অসিয়ত করে গেছেন।

​পারিবারিক কাঠামো সচল রাখা এবং সুশৃঙ্খল সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু প্রায়োগিক ও প্রাকৃতিক কারণে নারীর ওপর পুরুষের কিছুটা দায়িত্ব ও নেতৃত্বের প্রাধান্য থাকলেও, মানবীয় মূল্যবোধ, পরকালীন মুক্তি এবং সামাজিক অধিকারের সার্বিক মূল্যায়নে ইসলাম নারীজাতিকে পুরুষের সমকক্ষ করেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের ওপর নারীদের ভরণপোষণ ও নিরাপত্তার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব দিয়ে নারীকে করেছে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। ইসলাম নারীজাতিকে যে মান-মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম, দর্শন বা আধুনিক সমাজব্যবস্থা আজ পর্যন্ত উপহার দিতে পারেনি। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, নারীজাতির অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠায় ইসলামের এই অবদান বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য, অতুলনীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ ‘মহা ইনকিলাব’।

লেখক: শিক্ষার্থী, গবেষণামূলক উচ্চতর হাদিস বিভাগ।উস্তাদ, জামিয়া ওবাইদিয়া ফেরদাউসুল উলুম, মির্জানগর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন