Logo

ধর্ম

মুসলিম উম্মাহর সংকট ও উত্তরণের পথ

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১৩:৩৮

মুসলিম উম্মাহর সংকট ও উত্তরণের পথ

বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

​বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক আধিপত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর গভীরতা ছড়িয়ে পড়েছে চিন্তা, সংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন ভূখণ্ড দখলের চেয়ে মনস্তত্ত্ব দখলের লড়াইয়ে বেশি সক্রিয়। এই সুক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ফলে মুসলিম মানসে চরম হীনমন্যতা তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। ফলে নতুন প্রজন্ম ক্রমশ নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা হারিয়ে পাশ্চাত্য জীবনদর্শন ও চিন্তাধারার দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়ছে।

দ্বিমুখী বৈশ্বিক নীতি ও ভোগবাদের থাবা

​বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্বিমুখী নীতি, অন্যায় যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এবং বৈষম্যমূলক আচরণের প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে বিভিন্ন মুসলিম জনপদ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আজ উম্মাহর অধিকার রক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এর পাশাপাশি, অশ্লীলতা ও আধুনিক অনিয়ন্ত্রিত ভোগবাদী সংস্কৃতির তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ। পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অন্ধভাবে অনুকরণ করা কিংবা তাদের অপসংস্কৃতিকে ধারণ করাকেই অনেকে প্রগতি ও আধুনিকতার মাপকাঠি মনে করছে; যা তাদের নিজেদের গৌরবময় শিকড়, নৈতিক মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

নেতৃত্বের সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভেদ

​দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ মুসলিম বিশ্বে দূরদর্শী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও সামগ্রিক জনকল্যাণমুখী নেতৃত্বের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ শাসকই উম্মাহর স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাকে বড় করে দেখছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক সংঘাত, দলগত কোন্দল ও উপদলীয় ধর্মীয় বিভেদ। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যকে বিসর্জন দিয়ে অনেক সময় ক্ষুদ্র দলীয়, জাতিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শত্রুপক্ষ আমাদের আরও বেশি দুর্বল ও শোষিত করার সুযোগ পাচ্ছে।

সংকীর্ণতার অবসান ও ইতিহাসের শিক্ষা

​আমরা যদি নিজেদের ক্ষুদ্র গণ্ডি, প্রতিষ্ঠান, সুনির্দিষ্ট মতবাদ কিংবা গোঁড়ামির ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখি এবং সামগ্রিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উম্মাহর কল্যাণের কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের পতন অনিবার্য। সংকীর্ণ মানসিকতা উম্মাহর জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—যখনই কোনো জাতি তাদের পারস্পরিক ঐক্য হারিয়েছে, অভ্যন্তরীণ কলহে লিপ্ত হয়েছে এবং নিজেদের গৌরবময় আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়েছে, তখনই তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে বর্তমানের এই পতনকে ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব

​উম্মাহর এই চরম ক্রান্তিকালে ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সমাজচিন্তকদের দায়িত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাঁদের কেবল চিরাচরিত ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতি ও চিন্তাধারা সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। যুবসমাজকে আধুনিক নাস্তিক্যবাদ ও বিভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে কুরআন, সুন্নাহ ও সীরাতে রাসূল সা.-এর আলোয় জীবন গড়ার কোনো বিকল্প নেই। সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বুদ্ধিজীবী সমাজ যদি এখন থেকেই সমন্বিত, আধুনিক ও কার্যকর উদ্যোগ না নেন, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও বেশি পরানির্ভরশীল, লক্ষ্যহীন ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে।

ইসলামী সভ্যতার মূলমন্ত্র ও পুনর্জাগরণ

​ইসলামী সভ্যতার মূল ভিত্তিই হলো সার্বিক ন্যায়বিচার, উচ্চতর নৈতিকতা, মানবকল্যাণ এবং আত্মিক প্রশান্তি। মুসলিম উম্মাহর গৌরবময় অতীত কেবল ভূখণ্ড বিজয়ের ইতিহাস নয়, বরং তা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের স্বর্ণযুগ। তৎকালীন মুসলিম মনীষীরা বিশ্বকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। তাই বর্তমান পতন ও স্থবিরতা কাটাতে মুসলিমদের পুনরায় নিজস্ব গৌরবময় ঐতিহ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা এবং খাঁটি ইসলামী আদর্শের দিকে ফিরে আসতে হবে। বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে।

উত্তরণের মহাসড়ক: জ্ঞান, তাকওয়া ও ঐক্য

​আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর বিশ্বমঞ্চে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন গভীর ও প্রায়োগিক জ্ঞান, আল্লাহর নিখাদ ভয় (তাকওয়া), উচ্চ নৈতিক চরিত্র, ইস্পাতকঠিন বৈশ্বিক ঐক্য এবং দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্ব। আমাদের ভাঙা দেয়াল জোড়া লাগাতে হলে সংকীর্ণতা ভুলে একক উম্মাহর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহর শাশ্বত ও বৈপ্লবিক আলোয় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে সামগ্রিকভাবে ঢেলে সাজাতে পারলেই মুসলিম উম্মাহ তার হারানো সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও বিশ্বমঞ্চের নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন