বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস ২০২৬
প্রবীণদের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় ইসলাম
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬
প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা, মানসিক নির্যাতন, আর্থিক শোষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রবীণরা শুধু সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি নন, বরং তারা আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, বরকতের উৎস এবং দোয়ার ভাণ্ডার। কুরআন ও হাদিসে প্রবীণদের সম্মান, সেবা ও অধিকার রক্ষাকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামে পিতা-মাতা ও প্রবীণদের মর্যাদা
ইসলাম প্রবীণদের সম্মানকে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন—তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং ধমক দিও না, বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।”-(সূরা আল-ইসরা: ২৩)তাদের প্রতি দয়া ও বিনয়ের সাথে আচরণ কর এবং বল, হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”(সূরা আল-ইসরা: ২৪)আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।-(সূরা আল-আনকাবুত: ৮) এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে প্রবীণদের সম্মান করা আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ।
হাদিসে প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রবীণদের সম্মানকে ঈমানের পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
(তিরমিজি: ১৯২১) যে কোনো বৃদ্ধ মুসলমানকে তার বার্ধক্যের কারণে সম্মান করে, আল্লাহ তার জন্য এমন লোক নির্ধারণ করেন যারা তার বার্ধক্যে তাকে সম্মান করবে।”
(তিরমিজি: ২০২২) পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।-(তিরমিজি: ১৮৯৯) এসব হাদিস প্রমাণ করে প্রবীণদের সেবা করা জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
প্রবীণ নির্যাতন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে প্রবীণদের প্রতি নির্যাতন, অবহেলা ও অবমাননাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রবীণ নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত
* পিতা-মাতাকে অপমান করা বা কষ্ট দেওয়া
* খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করা
* সম্পত্তি আত্মসাৎ করা
* মানসিক চাপ ও অবজ্ঞা করা
* সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। এগুলো সবই ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
প্রবীণ নির্যাতনের প্রধান ধরন
* শারীরিক নির্যাতন: আঘাত, মারধর, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ
* মানসিক নির্যাতন: গালাগালি, অপমান, অবহেলা, হুমকি
* আর্থিক নির্যাতন: সম্পত্তি দখল, জালিয়াতি, জোর করে স্বাক্ষর
* অবহেলা: চিকিৎসা, খাদ্য ও নিরাপত্তা না দেওয়া
* সামাজিক নির্যাতন: পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা
প্রবীণ নির্যাতনের মূল কারণ
* ঈমান ও নৈতিকতার দুর্বলতা
* পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয়
* একক পরিবার ব্যবস্থার বিস্তার
* অর্থনৈতিক চাপ ও লোভ
* সম্পত্তি বিরোধ
* প্রবীণদের শারীরিক দুর্বলতা ও নির্ভরশীলতা
ইসলামে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব
ইসলাম পরিবারকে প্রবীণদের প্রধান আশ্রয়স্থল হিসেবে নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”(সূরা আল-ইসরা: ২৪) এই দোয়া কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও আজীবন সেবার শিক্ষা দেয়।
প্রবীণদের সেবা করার ফজিলত
- জান্নাত লাভের অন্যতম পথ
- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম
- জীবনে বরকত বৃদ্ধি
- দোয়া কবুলের কারণ
রাসূল (সা.) বলেন—সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে তার পিতা-মাতাকে বার্ধক্যে পেলেও জান্নাত অর্জন করতে পারল না।”(সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)
প্রবীণ নির্যাতনের সামাজিক ক্ষতি
* পরিবারে অশান্তি ও ভাঙন
* মানসিক রোগ ও বিষণ্নতা বৃদ্ধি
* নৈতিক অবক্ষয়
* সামাজিক অবিশ্বাস
* ভবিষ্যৎ প্রজন্মে নেতিবাচক প্রভাব
প্রতিরোধে ইসলামী দিকনির্দেশনা
(ক) পরিবার পর্যায়ে
* প্রবীণদের সম্মান ও ভালোবাসা
* ধৈর্য ও নম্র আচরণ
* নিয়মিত খোঁজখবর
* চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
* তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
(খ) সমাজ পর্যায়ে:
* প্রবীণবান্ধব পরিবেশ গঠন
* ইসলামী নৈতিক শিক্ষা প্রচার
* সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
* স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম
(গ) রাষ্ট্র পর্যায়ে:
* প্রবীণ কল্যাণ নীতি বাস্তবায়ন
* সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি
* স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন
* আইনি সুরক্ষা জোরদার
ইসলামের সার্বিক শিক্ষা
* প্রবীণদের সম্মান করা ঈমানের অংশ
* তাদের সেবা করা জান্নাতের পথ
* তাদের কষ্ট দেওয়া বড় গুনাহ
* পরিবার হলো তাদের নিরাপদ আশ্রয়
* দয়া ও সহানুভূতি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রবীণরা সমাজের বোঝা নয়; বরং তারা বরকত, অভিজ্ঞতা এবং দোয়ার উৎস। ইসলাম প্রবীণদের সম্মান ও সেবাকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের সম্মান করা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। আসুন আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অঙ্গীকার করি—কোনো প্রবীণ যেন অবহেলা, নির্যাতন বা একাকীত্বের শিকার না হন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রবীণদের সেবা করার তাওফিক দান করুন এবং তাদের দোয়ার মাধ্যমে জান্নাত নসীব করুন। আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। ইমেইল: drmazed96@gmail.com

