Logo

ধর্ম

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস আজ

ইসলামে মাদকের সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১৫:৩৪

ইসলামে মাদকের সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ

প্রতি বছর ২৬ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবসের উদ্দেশ্য হলো মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি নিরাপদ ও সুস্থ সমাজ গঠন। বর্তমান বিশ্বে মাদকাসক্তি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক, নৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সংকটে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব দৃশ্যমান।

ইসলাম মানবজীবনের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে জীবনব্যবস্থা প্রদান করেছে, সেখানে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের কোনো স্থান নেই। কারণ মাদক মানুষের বিবেক, চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে ধ্বংস করে দেয়। আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে তাই কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

মাদকবিরোধী দিবসের প্রেক্ষাপট

১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৬ জুনকে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল মাদক উৎপাদন, পাচার ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ঐক্য গড়ে তোলা। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা সভা, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। কারণ দেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

মাদকের বহুমাত্রিক ক্ষতি

মাদক কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক স্থিতি এবং সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।

মাদকের কারণে দেখা দিতে পারে—

* মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি

* হৃদরোগ ও লিভারের জটিলতা

* হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা

* শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা

* কর্মক্ষমতা হ্রাস

* পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদ

* কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি

* চুরি, ছিনতাই ও সহিংস কর্মকাণ্ড

* দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়

মাদকাসক্তি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে অবিশ্বাস, অস্থিরতা এবং অপরাধপ্রবণতা সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

ইসলামে নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবস্থান

ইসলাম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সক্ষমতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই যে কোনো বস্তু যা মানুষের জ্ঞান-বিবেককে আচ্ছন্ন করে, তা ইসলামে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ তাআলা বলেন—হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারণকারী শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ; অতএব তোমরা তা থেকে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।(সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়।”(সূরা আল-মায়িদাহ: ৯১)

এই আয়াতগুলোতে নেশাজাতীয় বস্তুর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষতির প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।

হাদিসে মাদকের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা

রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন—প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই হারাম।”(সহিহ মুসলিম: ২০০৩) অন্য হাদিসে এসেছে—যে বস্তু অধিক পরিমাণে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।”(সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮১; জামে তিরমিজি: ১৮৬৫) এ হাদিস ইসলামী শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ কোনো দ্রব্যের নাম পরিবর্তন করলেই তা বৈধ হয়ে যায় না; যদি তা নেশা সৃষ্টি করে, তবে তা হারাম।

মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধেও ইসলামের অবস্থান

ইসলাম শুধু মাদক সেবন নিষিদ্ধ করেনি; বরং এর উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রয় ও প্রচারকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—আল্লাহ মদের ব্যাপারে দশ শ্রেণির লোককে অভিশাপ দিয়েছেন—যে তা প্রস্তুত করে, প্রস্তুত করায়, পান করে, বহন করে, যার কাছে বহন করা হয়, পরিবেশন করে, বিক্রি করে, মূল্য ভোগ করে, ক্রয় করে এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়।”(সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৭৪; ইবনে মাজাহ: ৩৩৮০) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকেই গুরুতর গুনাহের অংশীদার।

মাদক ও ইসলামী নৈতিকতা

ইসলামী আইনশাস্ত্রে মানুষের জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ, বংশধারা ও ধর্মকে সংরক্ষণ করাকে মৌলিক উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাদক এই পাঁচটি বিষয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মাদক মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ব্যক্তি তার নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলে এবং সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

যুবসমাজকে রক্ষায় করণীয়

বর্তমান সময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান লক্ষ্য তরুণ ও কিশোর সমাজ। এ কারণে তাদের নৈতিক, মানসিক ও ধর্মীয়ভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা জরুরি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে; তাই সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা লক্ষ্য করা উচিত।”(সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩; জামে তিরমিজি: ২৩৭৮) সন্তানদের জন্য সৎ সঙ্গ, ধর্মীয় শিক্ষা, খেলাধুলা, বইপড়া এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

মাদকাসক্তদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম অপরাধকে ঘৃণা করে, কিন্তু সংশোধনের পথ বন্ধ করে না। যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিকিৎসা, পরামর্শ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন—তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।”(সূরা আয-যুমার: ৫৩) তাই মাদকাসক্তদের অবহেলা না করে তাদের পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেওয়া ইসলামী মানবিকতার অংশ।

মসজিদ, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

* পরিবারে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা

* মসজিদভিত্তিক সচেতনতামূলক আলোচনা বৃদ্ধি

* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা

* যুবকদের ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা

* পুনর্বাসন উদ্যোগকে শক্তিশালী করা

* মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাদক শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও বড় হুমকি। কোরআন ও সুন্নাহ মানুষের জীবন ও বিবেক রক্ষার স্বার্থে নেশাজাতীয় সবকিছু থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আজ প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস ২০২৬-এ আমরা প্রত্যেকে নেশার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও আলোকিত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করি।

লেখক: কলামিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। ইমেইল :drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন