Logo

ধর্ম

কওমিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা আসন্ন

পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের করণীয়

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:২৮

পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের করণীয়

শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো পরীক্ষা। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা যে নিবিড় প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তা সাধারণত 'খেয়ার' নামে পরিচিত। খেয়ারের দিনগুলো হলো পরীক্ষার আগে এমন কিছু সময়, যখন নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকে এবং শিক্ষার্থীরা এককভাবে বা দলগতভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আত্মনিয়োগ করে।

এ সময়ের সঠিক ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। পক্ষান্তরে, সময়ের অপচয় কিংবা অপরিকল্পিত মেহনত কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত করতে পারে। তাই উসতাদ, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের উচিত খেয়ারের দিনগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগানো। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।

১. রুটিনভিত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণ:

পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রথম শর্ত হলো একটি বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করা। পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী কোন বিষয়ে কতটুকু সময় দিতে হবে, কোন দিনে কোন কিতাব পড়তে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু পড়া শেষ করতে হবে—এসব খেয়ার আসার আগে থেকেই নির্ধারণ করে নেওয়া জরুরি।

পরিকল্পনাহীন পড়াশোনা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের অস্থির করে তোলে। কিন্তু সুশৃঙ্খল রুটিন শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে, সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং পড়া দীর্ঘ সময় মনে রাখতে সাহায্য করে।

২. কঠিন বিষয়গুলো উপযুক্ত সময়ে পড়া:

সকল বিষয়ের গুরুত্ব সমান হলেও কিছু বিষয় বা পাঠ তুলনামূলক কঠিন হয়ে থাকে। এসব পাঠ এমন সময়ে পড়া উচিত, যখন মন ও মস্তিষ্ক সতেজ থাকে। সাধারণত ফজর ও মাগরিবের পরের সময় কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরের সময়গুলো কঠিন বিষয় আয়ত্ত করার জন্য অধিক উপযোগী।

সহজ বিষয়গুলো পরে পড়া গেলেও কঠিন বিষয়গুলো বারবার পড়া, নোট তৈরি করা এবং বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

৩. না দেখে লেখার অনুশীলন করা:

শুধু মুখস্থ করলেই ভালো ফল অর্জন সম্ভব নয়; বরং মুখস্থ বিষয়গুলো না দেখে লিখে অনুশীলন করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার পর তা লিখে কিতাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো নির্ভুল ও সুন্দর লেখা। না দেখে লেখার অভ্যাস থাকলে বানান, উদ্ধৃতি, আরবি ইবারত কিংবা তথ্যগত ভুল সহজেই ধরা পড়ে। ফলে পরবর্তীতে একই ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

৪. সময় বেঁধে লেখার তামরীন করা:

অনেক শিক্ষার্থী পড়া ভালো জানলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র সম্পন্ন করতে পারে না। তাই পরীক্ষার আগে সময় নির্ধারণ করে উত্তর লেখার অনুশীলন করা প্রয়োজন।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর লিখে উসতাদের নিকট তা দেখালে ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাস্তব পরিবেশ সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়ে ওঠে।

৫. অতিরিক্ত রাত জাগা পরিহার করা:

অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, যত বেশি রাত জেগে পড়া যাবে তত বেশি প্রস্তুতি হবে। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। অতিরিক্ত রাত জাগা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি সৃষ্টি করে, ফলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

বিশেষ করে পরীক্ষার দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ শরীর ও সতেজ মনই ভালো পরীক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত।

৬. মুযাকারা বা পরস্পরের পড়া শোনায় গুরুত্ব দেওয়া:

খেয়ারের দিনগুলোতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে মুযাকারার সাথীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা খুবই ফলপ্রসূ। মুযাকারার মাধ্যমে নিজের ভুল ধরা পড়ে, অজানা বিষয় জানা যায় এবং পড়া দীর্ঘস্থায়ীভাবে মনে থাকে।

তবে মুযাকারা যেন আড্ডায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

৭. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা খাতায় লিপিবদ্ধ করা:

পড়াশোনার সময় পাশে একটি ছোট খাতা রাখা যেতে পারে। সেখানে পরীক্ষায় আসার মতো পড়া, কঠিন পড়া এবং জটিল শব্দের বানান কিংবা যে বিষয়গুলো বারবার ভুল হয়, তা লিখে রাখা উচিত।

পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পুরো কিতাব পড়ার পরিবর্তে এসব নোট পুনরায় দেখে নেওয়া অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়।

৮. পরীক্ষার আগের রাতের সঠিক ব্যবহার:

অনেকেই পরীক্ষার আগের রাত পর্যন্ত নতুন নতুন বিষয় পড়তে থাকে। এটি সাধারণত উপকারী হয় না; বরং অস্থিরতা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে।

পরীক্ষার আগের রাতে নতুন কিছু শুরু না করে পূর্বে পড়া বিষয়গুলো পুনরায় দেখে নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ঝালাই করাই অধিক ফলপ্রসূ।

৯. প্রয়োজনীয় সামগ্রী আগেই প্রস্তুত রাখা:

পরীক্ষার আগের দিনই প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী গুছিয়ে রাখা উচিত। প্রবেশপত্র, হার্ডবোর্ড, একাধিক কলম, স্কেল, পেন্সিল, রাবার, সাইনপেন ইত্যাদি আগেই প্রস্তুত করে রাখা ভালো।

একেবারে নতুন কলম ব্যবহার না করে আগে থেকেই কয়েকটি কলম চালু করে নেওয়া উচিত। এতে পরীক্ষার হলে অপ্রত্যাশিত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না।

১০. আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা:

পরীক্ষাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ভয় ও দুশ্চিন্তা অনেক সময় জানা বিষয়ও ভুলিয়ে দেয়। তাই ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে হবে এবং নিজের মেহনতের ওপর আস্থা রাখতে হবে।

অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে নিজের প্রস্তুতিকে উন্নত করার প্রতি মনোযোগী হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

১১. ইবাদত ও দোয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া:

একজন মুমিন শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা প্রস্তুতি কেবল পার্থিব প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, দোয়া এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা পরীক্ষায় বরকত বয়ে আনে।

মনে রাখতে হবে, মেহনত মানুষের দায়িত্ব, আর সফলতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে।

মনে রাখতে হবে, খেয়ারের দিনগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এ সময়ের সঠিক ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই উসতাদগণের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা, অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের একাগ্র মেহনত—এই তিনটির সমন্বয় ঘটলে পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করা কঠিন নয়। ইনশাআল্লাহ।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন