ভালো ফলাফলের কৌশল ও প্রস্তুতি
পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীর করণীয়—১
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১১:১৪
পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে:
* পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে ইস্তিঞ্জা ও ওযু সম্পন্ন করে সম্ভব হলে দুই রাকাত সালাতুল হাজত আদায় করুন। এরপর একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তাআলার কাছে সহজতা, সঠিক স্মরণশক্তি ও উত্তম ফলাফলের জন্য দোয়া করুন।
* পরীক্ষার প্রথম দিন নির্ধারিত সময়ের অন্তত আধাঘণ্টা আগে হলে উপস্থিত হোন। কারণ, প্রথম দিন সিট ও কক্ষ খুঁজে পেতে কিছুটা সময় লাগে। পরবর্তী দিনগুলোতে ১৫ মিনিট আগে পৌঁছালেই যথেষ্ট।
* পরীক্ষার হলে প্রবেশের সময় তাড়াহুড়া, দৌড়াদৌড়ি বা অস্থিরতা পরিহার করুন। শান্ত ও স্বাভাবিক মন নিয়ে হলে প্রবেশ করলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
* সম্ভব হলে হলে প্রবেশের আগে সূরা আল-কলম তিলাওয়াত করুন। নিজের আসনে বসে দুরুদ শরীফ, ইস্তিগফার এবং رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا (হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।) পড়তে থাকুন। এসব আমল অন্তরে প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
উত্তরপত্র হাতে পেয়ে:
* উত্তরপত্র হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় রোল নম্বর, নিবন্ধন নম্বর এবং প্রয়োজনীয় সব তথ্য যথাযথভাবে পূরণ করুন। পরে করব ভেবে ফেলে রাখবেন না।
* উত্তরপত্রের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা থেকেই যথাযথ মার্জিন টেনে লেখার জন্য প্রস্তুত করে রাখুন। ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পৃষ্ঠা খালি রাখা যাবে না।
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে:
* উত্তর লেখা শুরুর আগে প্রশ্নটি ভালোভাবে বুঝে নিন। প্রশ্নে ঠিক কী জানতে চাওয়া হয়েছে, কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কতটুকু লিখতে হবে—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করুন।
* পুরো প্রশ্নপত্র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অন্তত একবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। প্রয়োজনে একাধিকবার পড়ুন। অনেক সময় কোনো প্রশ্ন বাধ্যতামূলক থাকে, কোথাও বিকল্প প্রশ্ন থাকে বা পরের পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা থাকে। তাই সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র না পড়ে লেখা শুরু করবেন না।
* কোনো প্রশ্ন অস্পষ্ট মনে হলে বা বুঝতে অসুবিধা হলে নিজ আসনে দাঁড়িয়ে হলের দায়িত্বশীল শিক্ষকের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে নিন। অনুমাননির্ভর উত্তর দেওয়ার চেয়ে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে লেখা উত্তম।
* শুরুতেই কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দেবেন তা নির্ধারণ করুন। এরপর যে প্রশ্নটির উত্তর সবচেয়ে ভালোভাবে দিতে পারবেন এবং পূর্ণ নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—সেটি আগে লিখুন।
সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা:
* পরীক্ষার হলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও কেবল সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে না পারার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়। তাই পরীক্ষার শুরুতেই মোট সময়ের একটি পরিকল্পনা করে নেওয়া জরুরি। প্রশ্নপত্র পড়া এবং শেষ মুহূর্তে উত্তরপত্র পুনরায় দেখে নেওয়ার জন্য কিছু সময় আলাদা রাখুন। বাকি সময়টি প্রতিটি প্রশ্নের নম্বর অনুযায়ী ভাগ করে নিন।
এক্ষেত্রে একটি কার্যকর কৌশল হলো—যত নম্বরের প্রশ্ন, তার প্রায় দেড় গুণ মিনিটের মধ্যে উত্তর শেষ করার চেষ্টা করা। যেমন, ১০ নম্বরের প্রশ্ন ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রাখুন। কোনো একটি প্রশ্নে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে পরবর্তী প্রশ্নগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
* প্রতিটি উত্তর লেখা শুরু করার আগে এক থেকে দেড় মিনিট সময় নিয়ে মনে মনে উত্তরটির কাঠামো সাজিয়ে নিন। কোন বিষয়টি আগে, কোনটি পরে এবং কীভাবে উপসংহার টানবেন—এগুলো আগে ভেবে নিলে উত্তর হবে আরও সুসংগঠিত ও মানসম্মত। এতে অপ্রয়োজনীয় কাটাকাটি কমে এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় বাদ পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না।
উত্তর লেখায় বিশেষ লক্ষণীয়:
* প্রশ্নে যেভাবে উত্তর চাওয়া হয়েছে, ঠিক সেভাবেই উত্তর দিন। প্রশ্নের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা করে উত্তর দীর্ঘ করার চেষ্টা করবেন না। পরীক্ষক উত্তরপত্রে শব্দের সংখ্যা নয়; বরং সঠিক তথ্য, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
* প্রতিটি প্রশ্নের নির্ধারিত নম্বর অনুযায়ী উত্তর বড় বা ছোট করে লিখুন। পাঁচ নম্বরের প্রশ্নের জন্য দশ নম্বরের উত্তর লিখে সময় নষ্ট করা যেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমনি দশ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত লিখলেও কাঙ্ক্ষিত নম্বর পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
* একটি প্রশ্নের ক, খ, গ বা অন্যান্য অংশ থাকলে সেগুলোর উত্তর একই স্থানে ধারাবাহিকভাবে লিখুন। এতে উত্তরপত্র গোছানো থাকে এবং পরীক্ষকের জন্য মূল্যায়ন সহজ হয়।
* কোনো প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি জানা না থাকলেও সেটি ফাঁকা রাখবেন না। বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত যতটুকু সঠিক জানা আছে, তা-ই সুন্দরভাবে লিখুন। অনেক সময় আংশিক সঠিক উত্তরের জন্যও কিছু নম্বর পাওয়া যায়, যা চূড়ান্ত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উত্তরপত্রকে আকর্ষণীয় করুন:
* একটি সুন্দর উত্তরপত্র কেবল ভালো লেখার মাধ্যমেই নয়; বরং পরিচ্ছন্ন উপস্থাপনার মাধ্যমেও পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিষ্কার, সুন্দর ও সহজপাঠ্য হস্তাক্ষরে লেখার চেষ্টা করুন। অগোছালো লেখা, অতিরিক্ত কাটাকাটি কিংবা অপরিষ্কার উপস্থাপনা অনেক সময় ভালো উত্তরকেও ম্লান করে দেয়। সুন্দর হস্তলিপি পরীক্ষকের মনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে এবং উত্তর মূল্যায়নে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
* প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নতুন অনুচ্ছেদে শুরু করুন। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা শিরোনাম দাগ টেনে আলাদা করে উপস্থাপন করুন। এতে উত্তরপত্র আরও পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় দেখায়।
* যথাসম্ভব কাটাকাটি এড়িয়ে চলুন। কোনো ভুল হলে একটিমাত্র সরল দাগ দিয়ে কেটে দিন। বারবার দাগ দিয়ে ভুল ঢাকার চেষ্টা করবেন না। এতে উত্তরপত্রের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান সময়ও অপচয় হয়। (চলবে...)
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

