Logo

ধর্ম

ভাইরাল সংস্কৃতির বিষাক্ত প্রভাব

করতালির নেশায় বিবেকের বিসর্জন

Icon

আবু আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৮

করতালির নেশায় বিবেকের বিসর্জন

​ডিজিটাল প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উৎকর্ষের যুগে মানব সমাজ এক নতুন ও অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যার নাম ‘ভাইরাল’ হওয়ার তীব্র বাসনা। যা একসময় স্রেফ বিনোদন বা আকস্মিক ঘটনা ছিল, আজ তা এক সামাজিক উন্মাদনায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক, কমেন্ট আর অনুসারীর কৃত্রিম সংখ্যার ফ্রেমে আজ মানুষের মর্যাদা ও যোগ্যতা পরিমাপ করা হচ্ছে। সততা, প্রজ্ঞা কিংবা উন্নত চরিত্রের চেয়ে এখন সস্তা জনপ্রিয়তাই যেন সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি। এই ভার্চুয়াল করতালির মোহ মানুষকে এক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে নিজের আত্মসম্মানের চাবিকাঠি সঁপে দেওয়া হয়েছে স্ক্রিনের ওপারের একদল অচেনা মানুষের হাতে।

নবুয়তের মানদণ্ডে আত্মপ্রচারহীনতা

​আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে, মক্কার তপ্ত বালুকাময় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের যে জীবনদর্শন শিখিয়েছিলেন, তা এই সস্তা জনপ্রিয়তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই দর্শনে সাফল্যের মাপকাঠি কোটি মানুষের বাহবা নয়, বরং হৃদয়ের একনিষ্ঠতা বা 'ইখলাস' এবং আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্যতা। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে নিভৃতে জীবন কাটানো কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং তা আল্লাহর নৈকট্য ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের এক অনন্য রাজকীয় পথ।

​এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী আমাদের সতর্ক করে। হযরত সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ​"নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন বান্দাকে ভালোবাসেন, যিনি পরহেজগার, অন্তরে ধনী (স্বাবলম্বী) এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রাদপ্রদীপের আলোর বাইরে থাকেন।" (সহিহ মুসলিম: ২৯৬৫)

​জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির মোহ যে মানুষের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তা উল্লেখ করে রাসূল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির দ্বীন বা দুনিয়ার ব্যাপারে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া বা আঙুল উঁচিয়ে ইশারার পাত্র হওয়াই তার মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যদি না আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন (সুনানে তিরমিজি: ৩৪৫৩)।

​এমনকি কিয়ামতের দিন যে তিন শ্রেণীর মানুষকে দিয়ে জাহান্নামের আগুন সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত করা হবে—তারা হলেন লোকদেখানো শহীদ, আলেম এবং দানবীর। তাদের আমলের কোনো কমতি ছিল না, কমতি ছিল কেবল নিয়তের বিশুদ্ধতায়। তারা দুনিয়ায় মানুষের প্রশংসা বা ‘ভাইরাল’ হতে চেয়েছিল এবং আল্লাহ তাদের বলবেন যে, যা তারা চেয়েছিল তা দুনিয়াতেই পেয়ে গেছে, সুতরাং আজ তাদের জন্য আর কোনো প্রতিদান নেই (সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)।

মনোযোগের আধুনিক শৃঙ্খল

​সহিহ বুখারির একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসূল (সা.) দিনার, দিরহাম এবং জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় পোশাকের দাসত্বে লিপ্ত ব্যক্তিদের ধ্বংসের কথা বলেছেন, যাদের মানসিকতা হলো—কিছু পেলে সন্তুষ্ট, আর না পেলে অসন্তুষ্ট (সহিহ বুখারি: ৬৪৩৫)।

​আজকের ভাইরাল সংস্কৃতির ধারকদের দিকে তাকালে এই হাদিসের হুবহু প্রতিফলন দেখা যায়। অর্থলিপ্সার মতোই আজ তৈরি হয়েছে ‘অ্যাটেনশন’ বা মানুষের মনোযোগ পাওয়ার এক তীব্র দাসত্ব। ভিউ আর রিচ বাড়ানোর নেশায় মানুষ আজ নিজের পারিবারিক গোপনীয়তা, আত্মসম্মান এবং শালীনতা পর্যন্ত বিলিয়ে দিচ্ছে। স্ক্রিনের রিঅ্যাকশন বা ভিউ একটু কমলেই তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে, যা এক ধরণের আধুনিক মানসিক পরাধীনতা।

নিভৃতচারী জীবনের রাজকীয় মহিমা

​আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা সবসময় সামনের কাতারে থাকার, লাইমলাইটে আসার কিংবা কৃত্রিম নেতৃত্ব জাহির করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে প্রচারের আড়ালে থেকে একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের আভিজাত্য। রাসূল (সা.) সেই ধূলিধূসরিত, এলোকেশী একনিষ্ঠ সৈনিকের সুসংবাদ দিয়েছেন, যাকে পাহারার দায়িত্বে রাখলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনের কাতারে রাখলে পেছনেই সন্তুষ্ট থাকে (সহিহ বুখারি: ২৮৮৭)। দুনিয়ার মানুষ তাকে না চিনলেও, তার সুপারিশ কোথাও গ্রহণ করা না হলেও—আসমানের মালিকের কাছে সে অত্যন্ত সম্মানিত। আজকের প্রদর্শনীবাদী সমাজে এই আত্মপ্রচারহীন নিঃস্বার্থ চরিত্রগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লোকদেখানো মানসিকতা ও আমলের অসারতা

​ইসলামের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস বা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। কিন্তু বর্তমান 'শো-অফ' সংস্কৃতি আমাদের ইবাদত ও পুণ্যকর্মগুলোকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সামান্য দান-সদকা থেকে শুরু করে উমরাহ বা ইবাদতের পবিত্র মুহূর্তগুলোকেও লাইভ বা ক্যামেরাবন্দি করা হচ্ছে। এই লোকদেখানো মানসিকতাকে ইসলামে ‘রিয়া’ বা ছোট শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা মানুষের সমস্ত নেক আমলকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩০)।

ভার্চুয়াল মোহের বহুমাত্রিক সামাজিক বিপর্যয়

​মানসিক প্রশান্তি বিলোপ: যখন একজন মানুষের সুখ-দুঃখ ভার্চুয়াল জগতের লাইক-কমেন্টের ওপর নির্ভর করে, তখন সে স্থায়ী এক মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতায় ভোগে। অহংকার ও হতাশার দোলাচলে তার আত্মিক শান্তি বিনষ্ট হয়।

​নৈতিক অবক্ষয় ও কুরুচির বিস্তার: সস্তা ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মানুষ এখন নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে। মিথ্যা প্র্যাঙ্ক, অন্যকে নিয়ে ট্রল করা, গিবত এবং অশ্লীলতার প্রচার এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয়: একটি অর্থহীন কন্টেন্টের পেছনে তরুণ প্রজন্ম তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, পড়াশোনা এবং সৃজনশীল প্রতিভা নষ্ট করছে। অথচ অনর্থক বিষয় পরিহার করাই ছিল একজন প্রকৃত মুসলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য (সুনানে তিরমিজি: ২৩১৭)।

​শালীনতা ও লজ্জাবোধের অবসান: ইসলামে 'হায়া' বা লজ্জাবোধকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। কিন্তু ভাইরাল সংস্কৃতি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তার দেয়াল ভেঙে সবকিছুকে বাজারের পণ্যে পরিণত করেছে।

পরিশেষে আরশের দরবারে স্বীকৃতির সাধনা

​ভূমণ্ডল বা জমিনের বুকে কোটি মানুষের টাইমলাইনে ভাইরাল হওয়াই জীবনের আসল সার্থকতা নয়। প্রকৃত সফলতা হলো আসমানের দরবারে, আরশের মালিকের কাছে পরিচিত হওয়া। দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে মানুষের করতালির পেছনে ছুটতে গিয়ে যদি আমরা কিয়ামতের দিন রবের কাছে ‘অপরিচিত’ বা প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাই, তবে সেই জনপ্রিয়তার চেয়ে বড় দেউলিয়া আর কেউ নেই।

​আসুন, আমরা সংখ্যার উপাসনা এবং সস্তা প্রচারের মোহ ত্যাগ করে অন্তরের বিশুদ্ধতার সাধনা করি। আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হয়। জমিনের বুকে অখ্যাত ও ধূলিমলিন থেকেও যেন আমরা আসমানি দরবারে আল্লাহর প্রিয় মুখলিস বান্দা হিসেবে স্থান করে নিতে পারি—মুমিনের জীবনে এর চেয়ে বড় চাওয়া আর কিছু হতে পারে না। মহান আল্লাহ আমাদের এই ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক: আলেম, মুহাদ্দিস, লেখক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন