পরিবেশ সচেতনতায় কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ
(প্রথম পর্ব)
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৪
পৃথিবী আজ এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বন উজাড়, নদী-খাল ও জলাশয়ের দূষণ, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং নিরাপদ খাদ্যের সংকট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত দুর্বল হচ্ছে, ততই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ। পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি তাই এখন আর কেবল বিজ্ঞানী, গবেষক কিংবা পরিবেশবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় পরিবেশ সংরক্ষণকে আধুনিক বিশ্বের একটি নতুন ধারণা বলে মনে করি। অথচ ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই মানুষ, প্রকৃতি ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের শিক্ষা দিয়েছে, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইসলাম মানুষকে শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি; বরং আল্লাহর সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, সংযম, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারেরও শিক্ষা দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীর "খলিফা" বা প্রতিনিধি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই প্রতিনিধিত্ব কোনো আধিপত্যের প্রতীক নয়; বরং এটি একটি মহান দায়িত্বের ঘোষণা। মানুষের কাজ পৃথিবীকে ধ্বংস করা নয়, বরং তার ভারসাম্য রক্ষা করা; সম্পদকে নির্বিচারে ভোগ করা নয়, বরং আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করা। তাই একজন মুমিনের কাছে পরিবেশ রক্ষা কেবল নাগরিক কর্তব্য নয়; এটি আল্লাহর অর্পিত দায়িত্ব পালনেরও একটি অংশ।
কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মানুষকে প্রকৃতির দিকে গভীরভাবে চিন্তা করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। আকাশ, বৃষ্টি, নদী, পাহাড়, বৃক্ষ, ফল-ফসল ও প্রাণিজগত—এসব কেবল মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ নয়; এগুলো মহান রবের কুদরতের উজ্জ্বল নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং তাতে উদ্গত করেছি সব ধরনের মনোরম উদ্ভিদ।” (সূরা কাফ: ৭)। আবার অন্যত্র সতর্ক করে বলা হয়েছে, “মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যাতে তিনি তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।” (সূরা আর-রূম: ৪১)। আজকের পরিবেশগত সংকটের দিকে তাকালে এই আয়াতগুলোর তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
ইসলামের পরিবেশদর্শন কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ইসলাম অপচয়কে নিরুৎসাহিত করেছে, মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করেছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দিয়েছে। যে ধর্ম অজুর সময়ও অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যবহারে সতর্ক করে, সে ধর্ম কখনো প্রকৃতি ধ্বংস, বন উজাড় কিংবা সম্পদের নির্বিচার অপব্যবহারকে সমর্থন করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
এখানেই কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে হাজার হাজার কওমি মাদরাসায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে। এখান থেকেই গড়ে ওঠেন ভবিষ্যতের ইমাম, খতিব, মুফতি, মুহাদ্দিস, শিক্ষক ও সমাজপথপ্রদর্শকেরা। তাঁদের কথা, তাঁদের জীবনাচরণ এবং তাঁদের দিকনির্দেশনা সমাজের কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি হতে পারে একটি নৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সূতিকাগার।
যদি প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় যে একটি গাছ রোপণও সওয়াবের কাজ, পানির অপচয় আল্লাহর অপছন্দনীয়, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ আল্লাহর দেওয়া আমানতের হেফাজত—তবে সেই শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা ছড়িয়ে পড়বে মসজিদের মিম্বারে, পরিবারে, সমাজে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চায়। একটি ছোট্ট চারা যেমন একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়, তেমনি একটি সৎ শিক্ষা একসময় একটি জাতির সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে।
পরিবেশ রক্ষা আজ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি ঈমান, নৈতিকতা ও মানবিক দায়িত্বের সম্মিলিত আহ্বান। কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ যদি এই চেতনাকে শিক্ষা, দাওয়াত ও দৈনন্দিন অনুশীলনের অংশ করে তুলতে পারেন, তবে একটি সবুজ, সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের পথ অনেকটাই সুগম হবে। কারণ যে শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেয়, সেই শিক্ষা মানুষকে তাঁর সৃষ্টি সংরক্ষণের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে নয়; বরং আল্লাহর অর্পিত একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। এই নীতির সবচেয়ে সুন্দর প্রতিফলন পাওয়া যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের রাষ্ট্রপরিচালনায়। ইসলামের পরিবেশদর্শন কোনো তাত্ত্বিক দর্শন নয়; এটি জীবনঘনিষ্ঠ, বাস্তবমুখী এবং মানবকল্যাণকেন্দ্রিক।
মহানবী (সা.) এমন এক সমাজে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা ছিল না। তবুও তিনি মানুষকে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষায় একটি গাছ কেবল কাঠ বা ফলের উৎস নয়; বরং জীবন, কল্যাণ এবং সদকায়ে জারিয়ার প্রতীক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, কোনো পাখি কিংবা অন্য কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি)।
একটি সংক্ষিপ্ত হাদিসের মধ্যেই মানবকল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আখিরাতের প্রতিদানের এক অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে। ইসলাম তাই শুধু বৃক্ষরোপণের উৎসাহই দেয়নি; বরং একটি গাছকে বহু প্রাণের উপকারের মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
আজ যখন নির্বিচারে বনভূমি উজাড় হচ্ছে, তখন এই হাদিসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। একটি পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ গড়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগে, কিন্তু তা ধ্বংস করতে লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। একটি গাছ কাটা মানে শুধু কাঠ হারানো নয়; ছায়া, অক্সিজেন, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি অধিকারও নষ্ট করা। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে বৃক্ষরোপণ যেমন ইবাদত, তেমনি অকারণে বৃক্ষ ধ্বংস করা নৈতিক দায়িত্ববোধের পরিপন্থী।
পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ইসলামের শিক্ষা বিস্ময়করভাবে আধুনিক। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। অথচ চৌদ্দশ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করাও অপচয়। একবার তিনি সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে অজুর সময় বেশি পানি ব্যবহার করতে দেখে বললেন, “এই অপচয় কেন?” সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, “অজুতেও কি অপচয় হয়?” তিনি উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবাহমান নদীর তীরেও অবস্থান করো।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)। এই একটি হাদিসই প্রমাণ করে, ইসলাম সম্পদের প্রাচুর্য নয়; দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেয়।
প্রকৃতির প্রতি ইসলামের মমত্ববোধ যুদ্ধক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাধারণত যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ এবং সম্পদের অপচয়। কিন্তু ইসলাম যুদ্ধের মধ্যেও নৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম করতে দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং পরবর্তীকালে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—ফলবান বৃক্ষ কাটা যাবে না, শস্যক্ষেত ধ্বংস করা যাবে না, অকারণে পশু হত্যা করা যাবে না এবং অপ্রয়োজনীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যাবে না। ইতিহাস ও হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলো ইসলামের এই মানবিক ও পরিবেশবান্ধব যুদ্ধনীতির সাক্ষ্য বহন করে। এমন দৃষ্টান্ত সে সময়ের বিশ্বে ছিল অত্যন্ত বিরল।
ইসলামের পরিবেশনীতি কেবল মানুষকেন্দ্রিক নয়; এটি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেয়। কুরআনে বারবার মানুষকে আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, পশুপাখি এবং প্রকৃতির বিচিত্র নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। একজন মুমিন যখন একটি বৃক্ষের দিকে তাকান, তিনি শুধু একটি উদ্ভিদ দেখেন না; তিনি তাঁর রবের কুদরতের একটি নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। এই উপলব্ধিই মানুষকে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে।
দুঃখজনকভাবে আজ মুসলিম সমাজের বহু ক্ষেত্রেই এই চেতনার ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। কোথাও নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে, কোথাও পানির অপচয়, কোথাও পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতা, আবার কোথাও প্রকৃতিকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হচ্ছে। অথচ এসব আচরণ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও নববী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আজ যখন পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে, তখন মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে কুরআন ও সুন্নাহর এই চিরন্তন শিক্ষা। কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ যদি পরিবেশ সংরক্ষণকে দীনি দায়িত্ব হিসেবে মানুষের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন, তবে এটি কেবল একটি সচেতনতামূলক প্রচারণা হয়ে থাকবে না; বরং ইবাদত, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে একটি ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। আর সেই আন্দোলনের ভিত্তি হবে কুরআনের শিক্ষা, সুন্নাহর আদর্শ এবং মানুষের অন্তরে জাগ্রত তাকওয়া।
(চলবে… আগামীকাল দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব: কওমি মাদরাসায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, আলেমসমাজের বাস্তব ভূমিকা এবং সবুজ সমাজ গঠনে করণীয়)
লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা ও লেখক; পরিচালক, কতকিছুর হাট
ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com
আরও পড়ুন.. পরিবেশ সচেতনতায় কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

