
আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলের পুরোটাই দৌড়ের ওপর ছিল বিএনপি-জামায়াত। এর মধ্যেও সে সময় দল দুটির নেতা-কর্মীরা নিরন্তর আত্মত্যাগ করেছেন। মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, রাজপথে রক্ত দিয়েছেন। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি-জামায়াত। তবে দোর্দণ্ডপ্রতাপ থেকে একেবারে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে আওয়ামী লীগ। ৫ আগস্টের পর দলটির নেতাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে এবার ঈদেই কোথাও দাঁড়াতে পারেনি নেতা-কর্মীরা।
আওয়ামী লীগের শাসনামলের পুরোটা সময় ঈদ মানে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের কাছে বাড়তি আতঙ্ক। ঈদ মানেই ছিল হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার-হয়রানির ভয়। বহু নেতা-কর্মী নিজ বাড়িতে থেকে ঈদ উদযাপন করতে পারেননি। অনেকের ঈদ কেটেছে জেলে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে এবার ‘ভয়হীন’ স্বস্তির ঈদ উদযাপন করছেন দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী।
নেতারা বলছেন, এবারের ঈদে কার্বন-ডাই অক্সাইড মুক্ত অক্সিজেনযুক্ত বাতাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বজন হারানোর যন্ত্রণা। বিগত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে তাদের তটস্থ থাকতে হতো। এবার চমৎকার পরিবেশে নেতারা ঈদে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাই এবারের ঈদটি ছিল নেতা-কর্মীদের জন্য অন্যরকম এক স্বস্তির।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীই এখন ছন্নছাড়া। তাদের অবস্থা অনেকটা গত দেড় দশক পালিয়ে বেড়ানো বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের মতো। দলের বড় নেতাদের একাংশ দেশের বাইরে, একাংশ জেলে। কর্মী ও তৃণমূলের নেতারা এলাকাছাড়া। ঈদের কেনাকাটা দূরের কথা, ঈদগাহে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারছেন না। এমন ‘মানবেতর’ ঈদ কখনো কাটায়নি বৃহৎ এ দলটির নেতা-কর্মীরা।
অথচ ৮ মাস আগেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবন ছিল রীতিমতো রাজকীয়। ঈদ ছিল জমজমাট। অথচ এখন তারা ফেরারি।
দলটির নেতা-কর্মীরা বলছেন, তাদের জন্য এবারের ঈদ মানবেতর। নেতাদের খুঁজে পায় না কর্মীরা, খোঁজখবর নেয় না, এমন অভিযোগও আছে। আবার নেতারা বলছেন, সবার তো একই অবস্থা। কে কার খবর নেবে, কীভাবে নেবে?
এদিকে প্রায় এক দশক পর পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৫ সালের পর এবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লন্ডনে ঈদ উদযাপন করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
বরাবরের মতো ঈদের দিন দলের শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, এবার সেটা হয়নি। তবে ঈদের দিন রাত ৯টায় গুলশানে বিএনপি চেয়াপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে, পবিত্র ঈদুল ফিতর ও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, চিকিৎসার জন্য গত জানুয়ারিতে লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। ৮ থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি লন্ডনের দ্য ক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর সেখানে বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এবার ঈদ উদযাপনের বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছিরউদ্দিন নাছির বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক পর স্বৈরাচার হাসিনার পতন হয়েছে। ফ্যাসিবাদ মুক্ত পরিবেশে ঈদ নিঃসন্দেহে স্বস্তির। পাশাপাশি গত দেড় দশকে যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন তাদের জন্য এবারের ঈদ আরও বিষাদের।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান বলেন, ‘এবারের ঈদ একটু স্বস্তির। গত ঈদসহ গত দেড় দশকে বিভিন্ন ঈদে আমি নিজে কারাগারে ছিলাম। সেই তুলনায় এবারের ঈদ আমাদের জন্য বেশি স্বস্তির। বহু বছর পর আমরা স্বস্তি নিয়ে ঈদ উদযাপন করলাম।’
এবারের ঈদ উদযাপন উপলক্ষে যুবলীগ নেতা শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল বলেন, ‘১৯৭১ সালের পর এবার প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে মানবেতর ঈদ কাটায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। পরিবার, বাড়িঘর আত্মীয়-স্বজন ছাড়া ঈদ হয়েছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের।’
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের নেতা গোলাম ফারুক রুবেল বলেন, ‘আমরাই তো আত্মত্মগোপনে। হামলা-মামলায় জর্জরিত। ঈদ কি আর আমাদের আছে এখন? এত কষ্টের মধ্যে ঈদ কীভাবে হয়। নেতা-কর্মীরা তাদের দুঃখ-দুর্দশা নানাভাবে আমাদের কাছে পৌঁছায়।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অবাধ এ বাংলায় বিচরণ বন্ধ করেছিল। ঠিক ২০২৪ সালে একই অবস্থা বরণ করতে হচ্ছে। লাখ লাখ নেতা-কর্মী মামলা, হামলা জীবননাশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত থেকে যেদিন এদেশ রক্ষা করা যাবে সেদিনই হবে আওয়ামী লীগের জন্য ঈদ।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনও অধিকার নেই। আওয়ামী লীগ বাংলার মাটিতে রাজনীতি করতে পারবে না। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এখন বাংলাদেশের মানুষের গণদাবি।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগ ও মুজিববাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই রায় কীভাবে কার্যকর হবে? এটি আলোচনার বিষয়। যেহেতু বিচার প্রক্রিয়া চলছে, আমরা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল। রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্বস্তির ঈদেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের শহীদদের মায়েদের চোখের পানি ঝরেছে, এতিম সন্তানদের চোখে পানি ঝরেছে, বাবার চোখের পানি ঝরেছে, ভাই বোনের চোখের পানি ঝরেছে। আর যারা অপকর্ম করেছে, যারা খুনি তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে।’
জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন বলেন, ‘ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন পরিবেশে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করল নেতা-কর্মীরা।’
জাতীয়তাবাদী যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, ‘গত দেড় দশকে আমরা হামলা-মামলায় বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ছিলাম। এবার ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে শান্তিতে ঈদ উদযাপন করতে পারলাম।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘কার্বন-ডাই অক্সাইডযুক্ত অক্সিজেনযুক্ত বাতাসে নেতাকর্মীরা এবার ঈদ উদযাপন করল। আবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছে তারা কিন্তু ফেরত আসেনি। সুতরাং, সেই পরিবারের জন্য বিষয়টা বিষাদের।’
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গেলো ১৫ বছর আর এবারের ঈদের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কারণ নির্ভয়ে এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পেরেছে দেশের মানুষ। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে বলে প্রত্যাশা করি। ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য গত ১৫ বছরের যে সংগ্রাম, তা যেন পুরণ হয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, অবশ্যই জামায়াত-বিএনপি নেতা-কর্মীরা এবার ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করতে পেরেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের ভয়ে বিগত একযুগ এ দুই দলের নেতা-কর্মীরা ঈদ করতে পারেনি। তবে জনরোষের ভয়ে এবার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা ঈদ করতে পারেনি। এখান থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত, রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালনা করলে উভয়ের জন্য ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
বিকেপি/এমএবি/এমএইচএস