জুয়ার আগুনে পুড়ছে জীবন, কার্যকর উদ্যোগ এখনো অপ্রতুল
বিশেষ প্রতিনিধি:
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১৫:৪৬
সংগৃহীত
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। একসময় গোপন আসর বা তাসের টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকা জুয়া এখন স্মার্টফোনের পর্দায় পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতায় ভয়ংকরভাবে বিস্তার লাভ করেছে এই আসক্তি। এর ফলে সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যা, খুন, ঋণগ্রস্ততা ও পারিবারিক ভাঙনের মতো ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। অথচ কার্যকর প্রতিরোধে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এদের বড় অংশই তরুণ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবক।
করোনাকালেই বিস্তার
২০১৮-২০১৯ সালের দিকে দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার শুরু হলেও ২০২০ সালে করোনা মহামারির লকডাউনের সময় এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরে বন্দি মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ায় অনলাইন বেটিং অ্যাপগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই জুয়ার নেশায় পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছেন। কেউ ব্যবসার মূলধন হারিয়েছেন, কেউ বসতভিটা বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ঋণের চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
তরুণদের বড় অংশ ঝুঁকিতে
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্থাগুলোর গবেষণা অনুযায়ী, জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৩০ শতাংশ তীব্র মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। কিশোর থেকে শুরু করে কলেজশিক্ষার্থী, নির্মাণশ্রমিক, সিএনজিচালক, এমনকি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই নেশায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে ফেলে অ্যাপগুলো। পরে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে মানুষ ঋণের ফাঁদে পড়ে যায়।
সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভয়াবহতা
মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কক্সবাজার, যশোরসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনলাইন জুয়া ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় জুয়ার টাকায় হঠাৎ অনেকের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটেছে। কেউ দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, কেউ কিনেছেন বিলাসবহুল গাড়ি। অথচ তাদের দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই।
মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় কয়েকশ তরুণ বিভিন্ন বেটিং অ্যাপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আত্মহত্যা ও খুনের ঘটনা বাড়ছে
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে এক সরকারি চাকরিজীবী এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া ৪০ হাজার টাকা হারিয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেন।
আবার কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া ২২ হাজার টাকা জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন। পরে টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিনি নিহত হন।
গত বছরের ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার পৌরসভার এসএম পাড়ার ইমরান নামের এক তরুণ জুয়ার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। বগুড়া ও যশোরেও অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা, সহিংসতা ও পারিবারিক ভাঙনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সহজ লেনদেন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে সহজেই টাকা জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকায় অনলাইন জুয়ার বিস্তার আরও বেড়েছে।
সিকে৪৪৪, সিভি৬৬৬, নগদ৮৮, ক্রিক্রিয়া, ওয়ানএক্সবেট, বাবু৮৮ ও লাইনবেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশিয় বেটিং অ্যাপের মাধ্যমে চলছে এই জুয়ার আসর।
একাধিক এমএফএস এজেন্ট জানিয়েছেন, অনেক গ্রাহক দিনে কয়েকবার বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করছেন, যা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তাদের ধারণা।
শক্তিশালী এজেন্ট সিন্ডিকেট
তদন্তে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এজেন্ট নেটওয়ার্ক। মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পুরো চক্র। খেলোয়াড় হারলে কমিশন পান এজেন্টরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি জনপ্রিয় তারকাদের এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া ভিডিও ব্যবহার করেও মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা
এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০-এর বেশি জুয়ার সাইট ও অসংখ্য মোবাইল অ্যাপ ব্লক করা হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, অনলাইন অপরাধ দমনে জেলার সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না।
মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ পাচারের আশঙ্কা
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।
বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, অনলাইন জুয়া, হুন্ডি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে তারা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালাচ্ছেন। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
সমাজবিজ্ঞানী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রযুক্তি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং আর্থিক লেনদেনের কঠোর নজরদারি ছাড়া এই ভয়াবহ সামাজিক সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

