শচীন টেন্ডুলকার
বিশ্ব ক্রিকেটের এক অনন্য ও চিরস্মরণীয় একটি দিন ২৪ এপ্রিল। ৫৩ বছর আগে এই দিনে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক শিশু, যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটের অবিসংবাদিত সম্রাট—শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। নিখুঁত টেকনিক, অসামান্য ধৈর্য আর ২২ গজে রানের পাহাড় গড়ে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো যেকোনো ক্রিকেটারের জন্য আজন্ম লালিত স্বপ্ন। তার ৫৩তম জন্মদিনে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব এই ‘লিটল মাস্টার’কে শুভেচ্ছা বন্যায় ভাসাচ্ছে।
মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় শচীনের বাসভবনের
সামনে সকাল থেকেই ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। প্রতিবছরের মতো এবারও শচীন তার জন্মদিনে পরিবারের
সাথে সময় কাটিয়েছেন এবং বাড়ির বাইরে এসে ভক্তদের ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে বিসিসিআই, আইসিসি এবং বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটাররা শচীনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে
ক্রিকেটের আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শচীনের ব্যাটিং ছিল ক্রিকেটের বিশুদ্ধতম
শিল্পের নাম। নিখুঁত টেকনিক, নিখুঁত ভারসাম্য আর বোলার বল ছাড়ার আগেই লাইন-লেন্থ বুঝতে
পারার সেই অতিমানবীয় ক্ষমতা তাকে কিংবদন্তি করে তুলেছে। ক্রিকেট ইতিহাসে তার সমকক্ষ
ব্যাটিং শৈলী খুব কমই দেখা গেছে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলেন, শচীনের খেলায় কোনো দৃশ্যমান
দুর্বলতা ছিল না। মাঠের চারদিকে সমান দক্ষতায় শট খেলতে পারতেন তিনি। তার সেই বিখ্যাত
'ব্যাক-ফুট পাঞ্চ' কিংবা 'স্ট্রেইট ড্রাইভ' আজও ক্রিকেট প্রেমীদের চোখে লেগে থাকে।
শচীনের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সাফল্যগুলো
এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাক্রমশালী দলের বিপক্ষে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে পার্থের বাউন্সি
পিচে তার সেঞ্চুরিটি আজও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে বিবেচিত। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান
শচীনের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “শচীন আমাকে আমার
নিজের খেলার কথা মনে করিয়ে দেয়।” একজন ব্যাটারের জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি
আর কী হতে পারে!
১৯৮৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন শচীনের
অভিষেক হয়, তখন প্রতিপক্ষ ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। ওয়াকার ইউনুসের বাউন্সারে
নাক ফেটে রক্তাক্ত হওয়ার পরও মাঠ না ছাড়ার সেই জেদই বলে দিয়েছিল—তিনি বিশেষ কিছু
করতে এসেছেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
রেকর্ডের বরপুত্র: টেস্ট ও ওয়ানডে—উভয় ফরম্যাটেই
সর্বোচ্চ রান এবং সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক তিনি।
সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি: ২০১২ সালে ৩৯ বছর
বয়সের কাছাকাছি সময়ে তিনি বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ব্যাটার হিসেবে ১০০টি আন্তর্জাতিক
সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন।
প্রথম দ্বিশতক: ৩৭ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার
বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন
তিনি।
শচীনের কৃতিত্ব কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার
করা সম্ভব নয়। ২৪ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন শতকোটি মানুষের প্রত্যাশার
পাহাড়। ভক্তরা এতটাই আবেগপ্রবণ ছিল যে, শচীন সেঞ্চুরি না করলেই তারা সেটিকে ব্যর্থতা
মনে করত। এই প্রবল চাপকে জয় করেই তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পূজিত
ক্রিকেট আইকন।
২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে
স্টেডিয়ামে ২০০তম টেস্ট খেলে যখন তিনি বিদায় নেন, তখন পুরো ক্রিকেট বিশ্ব অশ্রুসিক্ত
নয়নে এই মহানায়ককে বিদায় জানিয়েছিল। মাঠ থেকে অবসর নিলেও শচীন আজও প্রতিটি ক্রিকেট
অনুরাগীর হৃদয়ে ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ হয়েই বেঁচে আছেন।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

