ফুটবল বিশ্বকাপ
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। শনিবার ইরানের ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআরআই) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের জাতীয় দল আসন্ন বিশ্ব আসরে অংশ নেবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আয়োজক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার কাছে ১০টি কঠোর শর্ত দিয়েছে তেহরান।
ফেডারেশনটি তাদের অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে,
"আমরা অবশ্যই ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করব। তবে আমাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, এবং
আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়েই আমরা এই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে চাই। আয়োজকদের
অবশ্যই আমাদের নিরাপত্তা ও সম্মান সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে
হবে।"
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের পর থেকেই বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ ঘিরে ঘোরতর অনিশ্চয়তা
তৈরি হয়। এর মধ্যে গত মাসে কানাডায় অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে অংশ নিতে গিয়ে বাধার মুখে
পড়েন ইরানের ফুটবল ফেডারেশন প্রধান মাহদি তাজ।
ইরানের সামরিক বাহিনীর শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’র (আইআরজিসি)
সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তার ভিসা বাতিল করে কানাডা। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে কানাডা
আইআরজিসিকে একটি ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই ঘটনার পর ইরান ফুটবল
ফেডারেশন মারমুখী অবস্থানে চলে যায় এবং আয়োজক দেশগুলোর কাছ থেকে তাদের প্রতিনিধি ও
খেলোয়াড়দের ‘সদাচরণের’ নিশ্চয়তা
দাবি করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে
মাহদি তাজ জানান, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে তারা ১০টি সুনির্দিষ্ট শর্ত দিয়েছেন।
শর্তগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো- খেলোয়াড়, কারিগরি কর্মী এবং ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের
কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই ভিসা প্রদান, টুর্নামেন্ট চলাকালে ইরানের জাতীয় পতাকা এবং
জাতীয় সংগীতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত, বিমানবন্দর, হোটেল এবং স্টেডিয়ামে
যাতায়াতের পথে দলের জন্য সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে ও দলের
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের ওপর কোনো প্রকার আঘাত বা হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো
রুবিও সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরানি ফুটবলারদের বিশ্বকাপে স্বাগত জানানো হবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠন আইআরজিসি-এর
সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ভিসা দেওয়া হবে না। এর জবাবে মাহদি তাজ বলেন,
"আমাদের অনেক খেলোয়াড় ও স্টাফ দেশের নিয়মানুযায়ী আইআরজিসিতে সামরিক দায়িত্ব পালন
করেছেন। মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফির মতো তারকা খেলোয়াড়রাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাদের
সবাইকে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভিসা দিতে হবে। যোগ্যতা অর্জন করে আসা কোনো দেশকে রাজনৈতিক
অজুহাতে বিশ্বকাপ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কোনো বহিঃশক্তির নেই।"
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইতোমধ্যেই
নিশ্চিত করেছেন যে, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ইরান যুক্তরাষ্ট্রেই তাদের ম্যাচগুলো খেলবে।
গ্রুপ ‘জি’–তে ইরানের
প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসর। প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৫ জুন, লস অ্যাঞ্জেলেস
(প্রতিপক্ষ: নিউজিল্যান্ড)। টুর্নামেন্ট চলাকালে ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা
অঙ্গরাজ্যের টাকসনে অবস্থান করবে এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে বাকি গ্রুপ পর্বের
ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম
আসর হতে যাচ্ছে যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নেবে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশের
এই যৌথ আয়োজনে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়,
ইরানের দেওয়া এই ১০ দফা শর্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো কতটা গ্রহণ করে এবং ফিফা
এই কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কী ভূমিকা পালন করে। তবে আপাতত তেহরানের এই ঘোষণার মধ্য
দিয়ে ফুটবলের মহাযজ্ঞে একটি বড় অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে গেল।
বাংলাদেশর খবর/এম.আর

