প্রবল বর্ষণ, আলোকস্বল্পতা আর প্রকৃতির বৈরিতাকে হার মানিয়ে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর এক সমাপ্তির মঞ্চ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার চলমান টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে ম্যাচের লাগাম স্বাগতিকদের হাতে। ১৭৯ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন দেখছে এক ঐতিহাসিক জয়ের। তবে সেই জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সময় এবং পাকিস্তানের পাল্টা চ্যালেঞ্জ।
সোমবার মিরপুরের আকাশে ছিল মেঘের ঘনঘটা।
মধ্যাহ্নবিরতির সময় শুরু হওয়া প্রবল বৃষ্টিতে মিরপুর স্টেডিয়ামের একাংশ প্রায় ডুবুডুবু
অবস্থায় ছিল। টানা ৩ ঘণ্টা ৫ মিনিট খেলা বন্ধ থাকায় গ্যালারির দর্শকরা যখন ম্যাচ পরিত্যক্ত
হওয়ার শঙ্কায় ছিলেন, তখনই শেরেবাংলার চমৎকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তার জাদু দেখাল।
বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে যখন খেলা পুনরায় শুরু হয়, তখন মাঠ ছিল খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
যদিও আলোকস্বল্পতার কারণে শেষ পর্যন্ত দিনের খেলা পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। সারা
দিনে মাত্র ৪৮.৪ ওভার খেলা হতে পেরেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমে শুরুতেই হোঁচট
খায় বাংলাদেশ। আগের দিনের ৭ রান নিয়ে খেলতে নেমে দলীয় ২৩ রানেই দুই ওপেনার মাহমুদুল
হাসান জয় ও সাদমান ইসলামকে হারায় স্বাগতিকরা। ৫ রান করে জয় এলবিডব্লিউ হন মোহাম্মদ
আব্বাসের বলে, আর ১০ রান করা সাদমান হাসান আলীর বাড়তি বাউন্স সামলাতে না পেরে ক্যাচ
দেন গালিতে।
শুরুতে উইকেট হারিয়ে চাপে পড়লেও বাংলাদেশের
উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অভিজ্ঞ মুমিনুল হক। প্রথম
ইনিংসে ১৭০ রানের জুটি গড়া এই যুগল দ্বিতীয় ইনিংসেও দলের হাল ধরেন। শাহিন আফ্রিদি ও
হাসান আলীদের দারুণ বোলিংয়ের বিপক্ষে লড়াই করে তৃতীয় উইকেটে ১০৫ রানের মহামূল্যবান
জুটি গড়েন তারা। চা বিরতির আগে দলকে ৯৩ রানে নিয়ে গিয়ে বড় লিডের ভিত গড়ে দেন এই দুই
বাঁহাতি ব্যাটার। চতুর্থ দিনের বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মুমিনুল হক। এদিন
তিনি ব্যক্তিগত ১৬ রানের মাথায় টেস্ট ক্যারিয়ারে ৫ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন।
তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমের পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এই অনন্য কীর্তি গড়লেন তিনি।
তবে ফিফটি করার পর আউট হওয়ার পুরোনো রোগ এদিনও মুমিনুলকে ছাড়েনি। দুবার জীবন পেয়ে ১২০
বলে ৫৬ রান করে শাহিন আফ্রিদির শিকার হন তিনি। এটি ছিল টেস্টে তার টানা পঞ্চম ফিফটি।
এর আগে ২০১০ সালে তামিম ইকবাল টানা ৫ ইনিংসে ফিফটি করেছিলেন। মুমিনুলের ক্যারিয়ারের
এটি ২৭তম ফিফটি হলেও তাকে আক্ষেপ পোড়াবে ৪৩তম ওভারের আউটে। ৪৪ বছর বয়সী এই ব্যাটারের
নামের পাশে ১৩টি সেঞ্চুরি থাকলেও ফিফটির সংখ্যা এখন ২৭।
প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্বিতীয় ইনিংসেও তার ফর্ম ধরে রেখেছেন। দিনের শেষ পর্যন্ত তিনি ১০৫ বলে ৫৮ রান করে অপরাজিত আছেন। তার সাথে রয়েছেন দলের অভিজ্ঞতম ব্যাটার মুশফিকুর রহিম, যিনি প্রথম ইনিংসে ৭১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ রানে অপরাজিত আছেন। আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ১৫২ রান তুলেছে। বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের মতে, তাদের লক্ষ্য এখন ২৯০ থেকে ৩০০ রানের লিড নেওয়া।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ইতিহাস বলছে, চতুর্থ ইনিংসে এখানে রান তাড়া করা
অত্যন্ত কঠিন। পরিসংখ্যান বলছে ২০১০ সালে ইংল্যান্ড ২০৯ রান তাড়া করে জিতেছিল, এ পর্যন্ত
এই মাঠে ১৫০-এর বেশি রান তাড়া করে জেতার ঘটনা আছে মাত্র একটি (২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার
২০৫ রান)। বাংলাদেশ যদি আজ সকালে আরও ১০০-১২০ রান যোগ করতে পারে, তবে পাকিস্তানের জন্য
লক্ষ্য দাঁড়াবে প্রায় ৩০০। মিরপুরের পঞ্চম দিনের উইকেটে যা তাড়া করা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশ যখন জয়ের স্বপ্ন বুনছে, তখন পাকিস্তান
দল ছুঁড়ে দিয়েছে পাল্টা চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে পাক অলরাউন্ডার
সালমান আগা বাংলাদেশকে ‘সাহস’ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সালমান আগা বলেন, “বাংলাদেশ যদি সাহসী হয় এবং আমাদের ৭০-৭৫ ওভারে ২৬০ রানের লক্ষ্য দেয়,
আমরা তা তাড়া করব। তবে আমার মনে হয় না তারা সেই সাহস দেখাবে।” তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ মূলত ম্যাচ বাঁচানোর চিন্তা করবে। তবে বাংলাদেশ
যদি ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত ইনিংস ঘোষণা করে, তবে পাকিস্তান জয়ের জন্যই মাঠে নামবে।
বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের
কণ্ঠে ছিল আশার সুর। তিনি জানান, তারা জয়ের জন্যই খেলছেন।
আশরাফুল বলেন, “আমাদের বোলিং আক্রমণ দারুণ। যদি কাল ৯০-৯৮ ওভার খেলার সুযোগ থাকে এবং
আমরা ৭৫ ওভার বোলিং করতে পারি, তবে ম্যাচ জেতা সম্ভব।” ওপেনারদের ব্যর্থতা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হলেও মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতায়
সন্তুষ্ট কোচ। বিশেষ করে মুমিনুল হকের ফর্ম নিয়ে তিনি আশাবাদী। আশরাফুল মনে করেন, মুশফিকের
পর মুমিনুলই হবেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ক্রিকেটার যিনি ১০০টি টেস্ট খেলার মাইলফলক স্পর্শ
করবেন। বর্তমানে ৭৬টি টেস্ট খেলা মুমিনুল যেভাবে রান করছেন, তাতে তার ফিটনেস ও ধারাবাহিকতা
কোচের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।
টেস্টে টানা ফিফটির রেকর্ড বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে অনন্য। মুমিনুল এর আগে ২০১৩-১৪ মৌসুমে টানা ১১ টেস্টে ফিফটি করেছিলেন,
যা বিশ্ব রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল (বিশ্ব রেকর্ড ১২ টেস্টের, এবি ডি ভিলিয়ার্স ও জো
রুটের)। বর্তমানে টানা পাঁচ ইনিংসে ফিফটি করে তিনি তামিমের পাশে বসলেন। তবে বিশ্ব ক্রিকেটে
টানা ৭ ইনিংসে ফিফটির রেকর্ড রয়েছে কুমার সাঙ্গাকারা, শিবনারায়ণ চন্দরপল ও লোকেশ রাহুলদের।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, পঞ্চম দিনে বৃষ্টির
সম্ভাবনা ক্ষীণ। পুরো দিনের খেলা হলে মিরপুর টেস্টের ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। বাংলাদেশের
কৌশল হবে কাল সকালে দ্রুত রান তুলে পাকিস্তানকে অন্তত ৭৫-৮০ ওভারের ব্যাটিং চ্যালেঞ্জে
ফেলা। অন্যদিকে পাকিস্তানের লক্ষ্য হবে সকালে দ্রুত বাংলাদেশের উইকেট তুলে নিয়ে লক্ষ্যটা
নাগালে রাখা। মিরপুরের ঘূর্ণি উইকেটে শেষ দিনে তাইজুল ও মিরাজদের ভূমিকা হবে মুখ্য।
নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ কি পারবে ঐতিহাসিক এক জয় ছিনিয়ে নিতে, নাকি
পাকিস্তানের অভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপ লক্ষ্য তাড়া করে চমক দেখাবে? সব উত্তরের জন্য অপেক্ষা
এখন মঙ্গলবার সকালের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (চতুর্থ দিন শেষে):
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪১৩/১০
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩৮৬/১০
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ১৫২/৩ (৫০.৩ ওভার)
নাজমুল ৫৮*, মুমিনুল ৫৬, মুশফিক ১৬*; হাসান
১/২৩, আব্বাস ১/৩৫।
অবস্থান: বাংলাদেশ ১৭৯ রানে এগিয়ে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

