মিরপুর টেস্ট
রানা তাণ্ডবে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ‘হ্যাটট্রিক’ টেস্ট জয়
মশিউর রহমান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ২০:৩২
অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক— মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো দর্শকের গগণবিদারী চিৎকার যেন এই শব্দগুলোকেই বারবার প্রতিধ্বনিত করছিল। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে টেস্টে হারিয়ে নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করল বাংলাদেশ। আগুনের গোলার মতো একেকটি ডেলিভারিতে পাকিস্তানি ব্যাটিং লাইনআপকে একাই তছনছ করে দিলেন তরুণ গতিদানব নাহিদ রানা।
১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে জিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে জোড়া টেস্ট জয়ের পর এবার ঘরের মাঠেও দাপট অব্যাহত রাখল টাইগাররা। এটি পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টানা তৃতীয় টেস্ট জয়।
মিরপুর টেস্ট জয়ের পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে দুটি লক্ষ্য ছিল: প্রথম সেশনে দ্রুত রান তুলে লিড ২৬০-২৭০ এ নিয়ে যাওয়া এবং পাকিস্তানকে অলআউট করার জন্য হাতে অন্তত ৭০-৭৫ ওভার সময় রাখা। চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ১৫২ রান, লিড ছিল ১৭৯। আজ সকালে মুমিনুল হকের ৫৬ রানের পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং মুশফিকুর রহিম ইনিংস বড় করার চেষ্টা করেন। মুশফিক ২২ ও লিটন ১১ রানে দ্রুত ফিরলেও শান্ত এক প্রান্ত আগলে রেখে খেলেন ১৫০ বলে ৮৭ রানের ঝকঝকে এক ইনিংস। তবে আক্ষেপ হয়ে থাকবে শান্তর বিশ্বরেকর্ডটি।
প্রথম ইনিংসে ১০১ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আর ১৩ রান করলেই বিশ্বের মাত্র চতুর্থ
ব্যাটার হিসেবে তিন টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরির মালিক হতেন তিনি। নোমান আলীর বলে রিভার্স
সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হয়ে মাঠ ছাড়লে ৯ উইকেটে ২৪০ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে
বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রান।
২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারেই হোঁচট খায় পাকিস্তান। তাসকিন আহমেদের গতির কাছে পরাস্ত হয়ে ২ রানে ফেরেন ওপেনার ইমাম-উল হক। লাঞ্চের পর প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আজান আওয়াইসকে (১৫) বোল্ড করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর দৃশ্যপটে আসেন নাহিদ রানা।
নিজের প্রথম স্পেলেই পাকিস্তান
অধিনায়ক শান মাসুদকে (২) সাজঘরে ফেরান তিনি। ৬৮ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর আব্দুল্লাহ
ফজল ও সালমান আগা মিলে ৫১ রানের এক লড়াকু জুটি গড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। চা-বিরতির
সময় পাকিস্তান ৩ উইকেটে ১১৬ রান তুলে ফেলেছিল, ম্যাচ তখন ড্রয়ের পথে বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু বিরতি থেকে ফিরেই টাইগার স্পিনার তাইজুল ইসলাম ৬৬ রান করা ফজলকে এলবিডব্লিউর
ফাঁদে ফেলে সবচেয়ে বড় বাধাটি সরিয়ে দেন। পরের ওভারেই তাসকিন গালিতে ক্যাচ দিতে বাধ্য
করেন সালমান আগাকে (২৬)।
এরপর শুরু হয় ‘নাহিদ রানা শো’। ১২১ রানে ৫ উইকেট হারানোর
পর পাকিস্তানের সব আশা একাই গুঁড়িয়ে দেন এই তরুণ পেসার। নিজের টানা তিন ওভারে তিনি
তুলে নেন সৌদ শাকিল (১৫), মোহাম্মদ রিজওয়ান (১৫) এবং নোমান আলীর (৪) উইকেট। বিশেষ করে
মোহাম্মদ রিজওয়ানকে দেওয়া ১৪৭ কিমি গতির সেই ইন-সুইঙ্গিং ডেলিভারিটি ছিল দেখার মতো,
যা সরাসরি স্টাম্প উপড়ে দেয়। শেষ দিকে তাইজুল হাসান আলীকে ফেরালে ৯ উইকেট হারায় পাকিস্তান।
এরপর শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে নিজের ‘ফাইফার’ পূর্ণ করেন নাহিদ রানা। ৪টি উইকেটই
তিনি শিকার করেন শেষ সেশনে। ৪০ রান খরচায় ৫ উইকেট নেওয়া নাহিদই আজ পাকিস্তানের পরাজয়ের
মূল কারিগর।
এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেল এক
অনন্য উচ্চতায়। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। এর আগের
১৫টি লড়াইয়ে কোনো জয় ছিল না। পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ৩টি টেস্ট জিতল টাইগাররা (রাওয়ালপিন্ডির
দুটিসহ)। বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার অনন্য
নজির গড়লেন নাহিদ রানা, এর আগে এই রেকর্ডে কেবল ৫ জন স্পিনারের নাম ছিল এবং ১০৪ রানের
এই জয় টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের অন্যতম আধিপত্য বিস্তারকারী জয়।
ঐতিহাসিক এই জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে
প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি
বলেন, “শান্ত-নাহিদদের
এই লড়াই দেশের ক্রিকেটে এক নতুন প্রাণশক্তি যোগ করেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টানা তৃতীয়
জয় আমাদের খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।”
ব্যাট হাতে ১৮৮ রান এবং বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বের
জন্য ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন নাজমুল হোসেন শান্ত। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে তিনি বলেন,
“পুরো দলকে নিয়ে
আমি গর্বিত। গত কয়েক মাস আমরা যে কঠোর পরিশ্রম করেছি, এটি তারই ফল। বোলারদের ওপর আমার
পূর্ণ আস্থা ছিল বলেই আমরা দ্রুত ইনিংস ঘোষণা করেছিলাম।” সিলেটের কন্ডিশন বুঝে আগামী
১৬ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে সিরিজ জয়ের পূর্ণ লক্ষ্যে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।
স্কোরবোর্ড একনজরে:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪১৩/১০ (শান্ত ১০১,
মুমিনুল ৫৬, মুশফিক ৫১; মিরাজ ৫ উইকেট)
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩৮৬/১০ (আজান সেঞ্চুরি;
মিরাজ ৫/১১০)
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ২৪০/৯ ডিক্লেয়ার (শান্ত
৮৭, মুমিনুল ৫৬)
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ১৬৩/১০ (ফজল ৬৬; নাহিদ
৫/৪০, তাসকিন ২/৩৪, তাইজুল ২/৪৫)
ফলাফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।

