মিনহাজুল আবেদীন নান্নু
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক সময় ‘পেস বোলার’ মানেই ছিল কেবল ইনিংসের শুরুতে কয়েক ওভারের আনুষ্ঠানিকতা। চড়া রোদ আর মরা উইকেটে স্পিনারদের হাতে বল তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হতো ফাস্ট বোলারদের। তবে গত কয়েক বছরে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের চিরাচরিত সেই দৃশ্যপটে এসেছে আমূল পরিবর্তন। গত সাত বছর ধরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মানোন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের সুফল এখন দৃশ্যমান হচ্ছে জাতীয় দলেও।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক
প্রধান নির্বাচক ও বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সদস্য মিনহাজুল আবেদীন নান্নু মনে করেন,
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পিচ ও বলে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতেই বদলে গেছে
দেশের পেস বোলিংয়ের সংস্কৃতি।
একটা সময় দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে
রান পাহাড় গড়া ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সেই রান আসত মূলত মন্থর ও ঘাসহীন উইকেটে। বোলারদের
জন্য সেখানে তেমন কিছুই থাকত না। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু জানান, এই সংস্কৃতি ভাঙতে
তারা পিচের ঘাসের ওপর বিশেষ নজর দিয়েছেন।
বর্তমানে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে
প্রতিটি ভেন্যুর উইকেটে অন্তত ৬ মিলিমিটার ঘাস রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নান্নু
বলেন, “আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে কীভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক
করা যায়, তা নিয়ে আমরা গত সাত বছর ধরে নিরলস কাজ করেছি। মাঠ ও পিচের প্রতিটি জায়গায়
ঘাসের উচ্চতা ৬ মিলিমিটার বজায় রাখা হচ্ছে। এর ফলে পেসাররা উইকেটে মুভমেন্ট পাচ্ছে,
যা তাদের উইকেট শিকারে উৎসাহিত করছে।”
বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি
এসেছে বলের ধরনে। আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘কোকাবুরা’ বল ব্যবহার করা হতো। কোকাবুরা বল সাধারণত
২০-২৫ ওভার পর কিছুটা নরম হয়ে যায় এবং সিমের ধার কমে যায়। ফলে স্পিনাররা আধিপত্য বিস্তার
করতেন। এই সংকট কাটাতে বিসিবি প্রবর্তন করেছে ইংল্যান্ডের তৈরি ‘ডিউক’ বল। ডিউক বলের বিশেষত্ব হলো এর সিম দীর্ঘস্থায়ী
হয় এবং এটি অনেক বেশি সময় ধরে সুইং করতে পারে। নান্নুর মতে, ডিউক বল প্রবর্তন করা ছিল
একটি মাস্টারস্ট্রোক।
তিনি বলেন, “কোকাবুরা বলের পরিবর্তে আমরা ডিউক বল চালু
করেছি। এটি তুলনামূলক বেশি সুইং করে, যা শুধু বোলারদের জন্য নয়, ব্যাটারদের স্কিল বা
দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বড় সুযোগ। এই বলের কারণেই আমাদের ফাস্ট বোলাররা ম্যাচের শেষ দিকেও
সমান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে।”
প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের চেয়েও বড় পরিবর্তন
এসেছে খেলোয়াড়দের মানসিকতায়। আগে যেখানে সারাদিন ফিল্ডিং করার পর শেষ বিকেলে বল করতে
অনীহা দেখা যেত, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ৬ মিলিমিটার ঘাসের পিচ আর ডিউক
বলের হাত ধরে পেসারদের মধ্যে এক ধরণের ‘পজিটিভ কম্পিটিশন’ বা ইতিবাচক প্রতিযোগিতা
তৈরি হয়েছে।
সাবেক এই অধিনায়কের ভাষায়, “ফাস্ট বোলারদের এখন সারাদিন মাঠে থাকার
পরও শেষ বিকেলে বোলিং করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তারা জানে, বলের কন্ডিশন এবং পিচ
তাদের সাহায্য করবে। এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সাফল্যের অন্যতম
প্রধান ভিত্তি।” মাশরাফি বিন মুর্তজা পরবর্তী যুগে তাসকিন আহমেদ, শরীফুল ইসলাম কিংবা
এবাদত হোসেনদের যে উত্থান, তার পেছনে ঘরোয়া ক্রিকেটের এই কাঠামোগত পরিবর্তন বড় ভূমিকা
রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঘরোয়া ক্রিকেটে কাঠামোগত উন্নতি হলেও ব্যবস্থাপনার
কিছু জায়গায় এখনও অপেশাদারিত্ব রয়ে গেছে বলে মনে করেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। বিশেষ
করে কোচ নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ঘাটতি স্পষ্ট। ক্ষোভ প্রকাশ করে
নান্নু বলেন, “আমরা এখনও ম্যাচের
মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে কোচ নির্ধারণ করার মতো অবস্থায় আছি। একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ বা
টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে কোচ ঠিক করা কোনোভাবেই পেশাদারিত্বের লক্ষণ নয়। এই
পরিস্থিতি থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।”
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, একজন কোচকে অন্তত
এক মাস আগে নিয়োগ দেওয়া উচিত যাতে তিনি খেলোয়াড়দের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে কাজ করার
পর্যাপ্ত সময় পান। টুর্নামেন্ট শুরুর দুই দিন আগে কোচ নিয়োগ দিলে তিনি কেবল ডাগ-আউটে
বসে থাকা ছাড়া বাড়তি কোনো অবদান রাখতে পারেন না।
মিনহাজুল আবেদীন নান্নু মনে করেন, গত সাত
বছরের কাজ একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে জেলা
ও বিভাগীয় পর্যায়ের একাডেমিগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পিচ কিউরেটরদের উন্নত প্রশিক্ষণ
এবং আম্পায়ারিংয়ের মান বাড়ানোও এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিশেষ করে টেস্ট
ফরম্যাটে টিকে থাকতে হলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডিউক বল আর বাউন্সি উইকেটের কোনো বিকল্প
নেই। বিসিবির অ্যাডহক কমিটির এই সদস্য আশাবাদী যে, যদি কোচিং প্যানেল এবং দল গঠনের
প্রক্রিয়া আরও আগেভাগে সম্পন্ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বমানের
একঝাঁক পেসার উপহার দিতে পারবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

