স্কোরবোর্ড বলছিল, ৩৮.২ ওভারে মাত্র ১১৬ রান তুলতেই নাই ৬ উইকেট! টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের গল্পটা যখন চিরচেনা এক ব্যাটিং বিপর্যয়ে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখনই জাদুকরের মতো আবির্ভূত হলেন লিটন কুমার দাস। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শুরু হলো তাঁর একক লড়াই।
‘একলা চলো রে’ নীতিতে লোয়ার অর্ডারদের আগলে রেখে, কখনো টেস্টের চিরায়ত ব্যাকরণ মেনে, আবার কখনো ওয়ানডে মেজাজে পাকিস্তানি বোলারদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি তুলে নিলেন এই স্টাইলিশ ব্যাটার। লিটনের ১২৬ রানের এই অতিমানবীয় ‘মাস্টারক্লাস’ ইনিংসে ভর করেই প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রানের লড়াকু পুঁজি পেয়েছে বাংলাদেশ।
জবাবে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের শেষ বিকালে
মাত্র ৬ ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ পায় পাকিস্তান। প্রথম দিনের আলো কমে আসার আগ পর্যন্ত
কোনো উইকেট না হারিয়ে সফরকারীদের সংগ্রহ ২১ রান। ওপেনার আজান আওয়াইস ১৩ এবং আব্দুল্লাহ
ফজল ৮ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন। বাংলাদেশের বোলাররা শেষ ঘণ্টায় ব্রেকথ্রু
না পেলেও, প্রথম ইনিংসের নিরিখে এখনো ২৫৭ রানে পিছিয়ে রয়েছে পাকিস্তান। তবে শেষ বিকালের
স্বস্তি বাদ দিলে, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রথম দিনের পুরো আলোটাই
একাই কেড়ে নিয়েছেন লিটন দাস।
শনিবার সকালে সিলেটের উইকেটে টস জিতে মেঘলা আকাশ আর ঘাসের ছোঁয়াকাজে লাগাতে বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ। তাঁর সেই সিদ্ধান্তকে প্রথম ওভারেই সঠিক প্রমাণ করেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আব্বাস। ইনিংসের প্রথম বলটি লেগ স্টাম্পের বাইরে থাকায় এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদন থেকে বেঁচে যান ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। তবে ঠিক পরের বলেই আব্বাসের ইনসুইং ডিফেন্ড করতে গিয়ে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসেন জয়।
রানের খাতা খোলার আগেই
জয়ের বিদায়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। শুরুর সেই ধাক্কা সামাল দিতে ইতিবাচক ক্রিকেট
খেলার চেষ্টা করেন মুমিনুল হক ও অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা তানজিদ হাসান তামিম। অভিষিক্ত
তানজিদকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল। মুমিনুলকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রান তুলে বিপর্যয়
কাটানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তিনি। তবে ১০ ওভারে দলীয় ৪৪ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ২৬ রানে
মোহাম্মদ আব্বাসের বলে একটি টপ এজ হয়ে বোলার আব্বাসের হাতেই সহজ ফিরতি ক্যাচ দিয়ে বসেন
তানজিদ। ৩৪ বলের ইনিংসে ৩টি চার মারেন এই তরুণ ওপেনার।
এরপর ক্রিজে আসেন আগের টেস্টে জোড়া হাফসেঞ্চুরি
করা অভিজ্ঞ মুমিনুল হক। উইকেটে থিতু হয়ে যাওয়ার পরও বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন তিনি।
খুররম শাহজাদের একটি দারুণ ভেতরে ঢোকা ডেলিভারির লাইন মিস করলে বল তাঁর ব্যাট ফাঁকি
দিয়ে অফ স্টাম্পের বেল উড়িয়ে দেয়। ৪১ বলে ৩ চারের সাহায্যে ২২ রান করে মুমিনুল যখন
ফেরেন, তখন ৬৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে স্বাগতিকরা। ৩ উইকেটে ১০১ রান তুলে কোনোমতে
প্রথম সেশনের লাঞ্চ বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। লাঞ্চ থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ দল পাকিস্তানি
বোলারদের তোপের মুখে পড়ে। দ্বিতীয় সেশনে মাত্র ১৫ রান তুলতেই সাজঘরে ফেরেন ৩ জন প্রথম
সারির ব্যাটার। উইকেটে থিতু হয়ে যাওয়া অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত মোহাম্মদ আব্বাসের
দুর্দান্ত সুইংয়ের ফাঁদে পড়েন। শট খেলবেন কি খেলবেন না—এমন দুটানায় পড়ে ব্যাটের কোণায়
লাগিয়ে উইকেটরক্ষকের গ্লাভসবন্দী হন শান্ত। ২৯ রান করা শান্তর বিদায়ে ভাঙে তাঁর ও মুশফিকের
মধ্যকার জুটি।
এরপর উইকেটে বেশ কিছুক্ষণ লড়াই করেও শাহজাদের বলে এলবিডব্লিউর শিকার হন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। ৬৪ বল খেলে মাত্র ২৩ রান করতে সক্ষম হন তিনি। সাতে নামা মেহেদী হাসান মিরাজ দলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। খুররম শাহজাদের তৃতীয় শিকার হয়ে ডিপ ফাইন লেগে ক্যাচ দেওয়ার আগে মিরাজ করেন মাত্র ৪ রান। ফলে ৩৮.২ ওভারে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে অলআউটের চরম শঙ্কায় পড়ে বাংলাদেশ। আউট হওয়া প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের কেউই ৩০ রানের কোঠা স্পর্শ করতে পারেননি। মিরাজ যখন আউট হন, তখন লিটন দাসের ব্যক্তিগত রান ছিল মাত্র ২।
পিচে তখন পাকিস্তান পেসারদের বল রীতিমতো
কথা বলছে, একমাত্র স্পিনার সাজিদ খানও ধরছিলেন টার্ন। অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে
আসেন তাইজুল ইসলাম। এই কন্ডিশনে তাইজুল কতক্ষণ টিকবেন, তা নিয়ে খোদ গ্যালারিতেও ছিল
শঙ্কা। কিন্তু লিটন যেন মনে মনে এক ভিন্ন ছক কষে রেখেছিলেন।
লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক থেকে আড়ালে রাখতে লিটন এক অনন্য রণকৌশল বেছে নেন। ওভারের প্রথম চার-পাঁচটি বল তিনি নিজে খেলতেন এবং সিঙ্গেলস নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা ফিরিয়ে দিতেন। ওভারের শেষ বলে নিখুঁত কৌশলে ১ রান নিয়ে প্রান্ত বদল করতেন, যাতে পরের ওভারের শুরুতে আবার নিজেই স্ট্রাইকিং প্রান্তে থাকতে পারেন। এই অসামান্য ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার কারণে পাকিস্তানের বোলাররা লোয়ার অর্ডারদের ওপর চেপে বসার সুযোগ পাননি। লিটনের এই কৌশলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তাইজুলও। সপ্তম উইকেট জুটিতে লিটন ও তাইজুল মূল্যবান ৬০ রান যোগ করেন। তাইজুল নিজে ১৬ রান করতে ৪০টি বল খেলেন, যা অন্য প্রান্তে লিটনকে হাত খুলে খেলার লাইসেন্স দেয়।
অবশেষে সাজিদ খানের বলে বোল্ড হয়ে তাইজুল ফিরলে ১৭৬ রানে ৭ম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
এরপর দ্রুতই বিদায় নেন তাসকিন আহমেদ (৭)। খুররম শাহজাদের চতুর্থ শিকার হয়ে স্লিপে সালমান
আলী আগার হাতে ক্যাচ দেন তাসকিন। ২১৪ রানে ৮ম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
২১৪ রানে ৮ উইকেট হারানোর পর মনে হচ্ছিল
বাংলাদেশের ইনিংস আড়াইশর নিচেই থমকে যাবে। কিন্তু নবম উইকেটে শরিফুল ইসলামকে সঙ্গে
নিয়ে পাকিস্তানি বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ
শুরু করেন লিটন। খুররম শাহজাদকে চার মেরে ১৩৫ বলে টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরির
ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছান এই ক্লাসিক ব্যাটার। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি লিটনের টানা দ্বিতীয়
টেস্ট শতক। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতেও ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানো দলকে উদ্ধার করে
১৩৮ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।
সেঞ্চুরির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন লিটন। সাজিদ খানকে দুই ফিল্ডারের মাঝ দিয়ে সুইপ করে চার মারা কিংবা খুররম শাহজাদকে দৃষ্টিনন্দন হুক শটে ছক্কা মারা—সব মিলিয়ে লিটনের ব্যাটিং ওল্ড ট্রাফোর্ডের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নবম উইকেটে শরিফুল ও লিটন আরও ৬৪ রান যোগ করেন। শরিফুল ১২ রান করে অপরাজিত থাকলেও, দলীয় ২৭৮ রানের মাথায় হাসান আলীকে পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে আবদুল্লাহ ফজলের হাতে ক্যাচ দিয়ে শেষ হয় লিটনের ১৫৯ বলে ১২৬ রানের রাজসিক ইনিংস। তাঁর এই চোখধাঁধানো ইনিংসটি সাজানো ছিল ১৬টি চার ও ২টি ছক্কায়।
লিটনের বিদায়ের পর শেষ ব্যাটসম্যান নাহিদ
রানা কোনো রান না করেই হাসান আলীর দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হলে ২৭৮ রানে থামে বাংলাদেশের
প্রথম ইনিংস। পাকিস্তানের পক্ষে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন খুররম শাহজাদ। তিনি ২১ ওভারে
মাত্র ৪টি মেডেনসহ ৪ উইকেট নেন। এছাড়া অভিজ্ঞ মোহাম্মদ আব্বাস ৩টি, হাসান আলী ২টি এবং
সাজিদ খান ১টি উইকেট শিকার করেন।
বাংলাদেশের ইনিংস ৭৭ ওভারে ২৭৮ রানে শেষ
হওয়ার পর, দিনের শেষ ভাগে ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ পায় পাকিস্তান। দিনের খেলা বাকি ছিল
মাত্র ৬ ওভার। এই অল্প সময়ে কোনো অঘটন ঘটতে দেননি পাকিস্তানের দুই ওপেনার আজান আওয়াইস
ও আবদুল্লাহ ফজল। বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এই ৬ ওভারে তাসকিন আহমেদ,
শরিফুল ইসলাম, মেহেদী মিরাজ ও নাহিদ রানাকে দিয়ে বল করালেও পাকিস্তানের উদ্বোধনী জুটি
ভাঙা সম্ভব হয়নি। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে দেখে-শুনে খেলে ৬ ওভারে ২১ রান তুলে দিন শেষ করে
সফরকারীরা। পাকিস্তান ১০ উইকেট হাতে নিয়ে এখনো ২৫৭ রানে পিছিয়ে থাকলেও, ফ্ল্যাট উইকেটে
শেষ বিকেলের এই শুরু তাদের মানসিকভাবে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। সিলেট টেস্টের প্রথম দিনের
খেলা শেষে ম্যাচটি এখন দারুণ এক রোমাঞ্চকর মোড় নিয়েছে।
টপ অর্ডারের ভরাডুবির পর লিটন দাসের একক
বীরত্বে বাংলাদেশ যে ২৭৮ রান তুলতে পেরেছে, তা মানসিকভাবে স্বাগতিকদের অনেক স্বস্তি
দেবে। তবে দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের বোলারদের চড়া মূল্যে উইকেট ভাঙতে হবে। সিলেটের উইকেট
সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটিংয়ের জন্য আরও সহজ হয়ে ওঠে। তাই রোববার সকালে তাসকিন-শরিফুলদের
দ্রুত ব্রেক-থ্রু এনে দিতে না পারলে, পাকিস্তানের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনেআপের সামনে
বাংলাদেশকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হতে পারে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৭৭ ওভারে ২৭৮ (লিটন
১২৬, নাজমুল ২৯, তানজিদ ২৬, মুশফিক ২৩, মুমিনুল ২২; খুররম ৪/৮১, আব্বাস ৩/৪৫, হাসান
২/৪৯)। পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৬ ওভারে ২১/০ (আওয়াইস ১৩*, ফজল ৮*)।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

