Logo

খেলা

সিলেট টেস্ট

ইতিহাস গড়লেন মুশফিক, বিশ্ব রেকর্ডের পাহাড়সম লক্ষ্য পাকিস্তানের

Icon

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১৯:৩৯

ইতিহাস গড়লেন মুশফিক, বিশ্ব রেকর্ডের পাহাড়সম লক্ষ্য পাকিস্তানের

মুশফিকুর রহিম

ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে রানের ফোয়ারা, বোলারদের উইকেটের আগ্রাসন আর এক অভিজ্ঞ সেনাপতির ইতিহাস গড়া বীরত্ব- সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বধের মঞ্চটা ঠিক এভাবেই সাজিয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটকে বলা হয় সেশন বাই সেশনের খেলা, যেখানে প্রতি মুহূর্তে দরকার হয় ধৈর্য আর মনস্তাত্ত্বিক জয়। সিলেট টেস্টের প্রথম তিন দিনে এমন একটি সেশনও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে পাকিস্তান ক্রিকেট দল একক দাপট দেখাতে পেরেছে। প্রতিটি সেশনে দাপুটে ক্রিকেট খেলে ম্যাচের লাগাম নিজেদের হাতেই রেখেছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। যার ফলশ্রুতিতে, ম্যাচের দুই দিন বাকি থাকতেই জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছে টিম টাইগার্স।

সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন সোমবার নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে সবকটি উইকেট হারিয়ে ৩৯০ রানের এক বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ইনিংসের ১৫৬ রানের লিডসহ সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে ৪৩৭ রান। টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এত রান তাড়া করে ম্যাচ জেতার কোনো রেকর্ড নেই। ফলে সিলেট টেস্টে ধবলধোলাই বা হার এড়াতে হলে পাকিস্তানকে গড়তে হবে এক অবিশ্বাস্য বিশ্ব রেকর্ড। দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২ ওভার খেলার সুযোগ পায় পাকিস্তান। তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামের করা দুটি ওভারই মেডেন হলেও কোনো উইকেট হারায়নি সফরকারীরা। বিনা উইকেটে ০ রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তারা। জয়ের জন্য এখনো ৪৩৭ রান প্রয়োজন বাবর আজম-শান মাসুদদের, আর বাংলাদেশের দরকার ১০টি উইকেট।

পাকিস্তানের সামনে অসম্ভব এক পাহাড়: টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার বিশ্ব রেকর্ডটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের দখলে। ২০০৩ সালে অ্যান্টিগায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৮ রান তাড়া করে জিতেছিল ক্যারিবীয়রা। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অক্ষত থাকা সেই বিশ্ব রেকর্ড ভাঙলেই কেবল এই ম্যাচে জয় পাওয়া সম্ভব পাকিস্তানের পক্ষে। পাকিস্তানের নিজস্ব টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ডটি ৩৭৭ রানের। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার পাল্লেকেলেতে ইউনিস খানের অপরাজিত ১৭১ এবং বর্তমান অধিনায়ক শান মাসুদের সেঞ্চুরিতে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল তারা। তবে ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতায় সেই পাকিস্তান আর এই পাকিস্তানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বর্তমান এই পাকিস্তান দলে ইউনিস খান কিংবা মিসবাহ-উল-হকের মতো কোনো ক্রাইসিস ম্যান’ নেই। দলটির বিদেশের মাটিতে জেতার রেকর্ডও এখন তলানিতে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিতেছিল তারা, এরপর টানা ৬টি অ্যাওয়ে টেস্টে হারের মুখ দেখতে হয়েছে তাদের।

বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ২৬১ রান তাড়া করে জেতার একটি রেকর্ড আছে, যা এসেছিল ২০০৩ সালের মুলতান টেস্টে ইনজামাম-উল-হকের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরির ওপর ভর করে। তবে সিলেটের এই স্পিন ও পেসের চারণভূমিতে তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ কিংবা গতিদানব নাহিদ রানাদের সমন্বয়ে গঠিত বৈচিত্র্যময় বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ৪৩৬ রান পাড়ি দেওয়া পাকিস্তানের এই ভঙ্গুর ব্যাটিং লাইনের জন্য কল্পনাতীত বললেও ভুল হবে না।

রেকর্ড, অধ্যবসায় আর বুনো উল্লাসে অনন্য মুশফিক: সোমবার দিনটি যদি টেস্ট ক্রিকেটের সমার্থক শব্দ হিসেবে মুশফিকুর রহিম’ নামটিকে উৎসর্গ করা হয়, তবে বোধহয় ভুল হবে না। চায়ের বিরতিতে যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, মুশফিকের নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছিল ৯০ রান। বিরতি থেকে ফেরার পর পাকিস্তানের পেসার মোহাম্মদ আব্বাসকে চার মেরে যখন সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করলেন, ততক্ষণে খরচ হয়ে গেছে ২৩টি ডেলিভারি। বলটি সীমানা দড়ি পার হতেই মুশফিক বুঝে যান তাঁর অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত উঁচিয়ে ধরলেন আকাশের দিকে। তারপর উইকেটের মাঝেই শুরু হলো এক বুনো উল্লাস- যেখানে মিশে ছিল স্বস্তি, আবেগ, তৃপ্তি আর বহু বছরের ক্লান্তিহীন শ্রমের এক অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ। নন-স্ট্রাইকে থাকা স্পিনার তাইজুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরার পর সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে উইকেটের ওপরই সিজদায় অবনত হন তিনি।

৩৯ বছর বয়সী এই ওল্ড গার্ড’ আবারও মনে করিয়ে দিলেন, বয়সটা কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। ১৭৮ বলে ৯টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছান তিনি। শেষ পর্যন্ত সাজিদ খানের বলে মোহাম্মদ আব্বাসের হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ২৩৩ বলে ১৩৭ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন তিনি, যা সাজানো ছিল ১২টি চার ও ১টি ছক্কায়।

এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে মুমিনুল হককে (১৩টি সেঞ্চুরি) পেছনে ফেলে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে সর্বোচ্চ ১৪টি সেঞ্চুরির মালিক এখন মুশফিকুর রহিম। চলতি সিরিজের প্রথম টেস্টেই মুমিনুলের সামনে সুযোগ ছিল মুশফিককে ছাড়িয়ে যাওয়ার, কিন্তু তিনি ৯১ রানে আউট হয়ে সুযোগ হাতছাড়া করেন। মুশফিক আজ সেই ভুল করেননি। তিন সংস্করণ মিলিয়ে এটি মুশফিকের ২৩তম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি, তাঁর ওপরে আছেন কেবল ২৫টি সেঞ্চুরি করা তামিম ইকবাল। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। ৩৯ বছর ৭ দিন বয়সে শতক হাঁকিয়ে তিনি এখন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক সেঞ্চুরিয়ান।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১৬ হাজারি ক্লাবে: মুশফিকের এই ঐতিহাসিক ইনিংসটি কেবল একটি সেঞ্চুরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি তাঁকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক অনন্য ও অলঙ্ঘনীয় উচ্চতায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট (টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি) মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১৬ হাজার রানের গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৩ রান করা মুশফিক সোমবার দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ রান করার সাথে সাথেই এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। বর্তমানে ৪৭৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ শেষে তাঁর মোট রান সংখ্যা ১৬,০১১। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর নামের পাশে রয়েছে ২২টি সেঞ্চুরি এবং ৮৫টি হাফ সেঞ্চুরি, যেখানে ব্যাটিং গড় প্রায় ৩৫।

বাংলাদেশের হয়ে রান সংগ্রাহকদের তালিকায় মুশফিকের পরেই আছেন তামিম ইকবাল (৩৮৭ ম্যাচে ১৫, ১৯২ রান)। তালিকায় এরপর আছেন যথাক্রমে সাকিব আল হাসান (১৪,৭৩০ রান), মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (১১,০৪৭ রান) এবং লিটন কুমার দাস (৮,৮৪১ রান)। ২১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে মাত্র ১০২টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন মুশফিক। বাংলাদেশের মতো কম টেস্ট খেলা দেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাঁর ৭,৩০০-এর বেশি টেস্ট রান ও ১৬ হাজার আন্তর্জাতিক রান এক অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের গল্প বলে।

শান্তর দ্রুত বিদায় ও লিটন-মুশফিকের দেয়াল: এর আগে সোমবার সকালে ১৫ রানের লিড নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। আগের দিন ১৩ রানে অপরাজিত থাকা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত আজ বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন। দিনের পঞ্চম ওভারেই খুররম শাহজাদের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন তিনি। ৪৬ বলে ১৫ রান করে শান্ত রিভিউ নিয়েও নিজের উইকেট বাঁচাতে পারেননি। ২৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন কিছুটা চাপে, তখন ক্রিজে আসেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান ও ক্রাইসিস ম্যান’ লিটন দাস।

মুশফিকুর রহিমের সাথে মিলে লিটন গড়েন ১২৩ রানের এক প্রতিরোধ ও আক্রমণাত্মক জুটি। লাঞ্চের আগেই এই জুটি বাংলাদেশের লিডকে ২৪৯ রানে নিয়ে যায়। লাঞ্চ থেকে ফিরেই লিটন মাত্র ৬১ বলে তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের ২০তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন। প্রথম ইনিংসে ১৫৯ বলে ১২৬ রান করা লিটন সোমবার আউট হন ৬৯ রান করে। এই টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে তিনি মোট ১৯৫ রান করেছেন, যা এক ম্যাচে তাঁর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রান (এর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৯৩ রান করেছিলেন)।

লিটন আউট হওয়ার পর মেহেদী হাসান মিরাজ ৩৯ বলে ১৯ রান করে সাজঘরে ফিরলেও, তাইজুল ইসলামকে নিয়ে লড়াই জারি রাখেন মুশফিক। তাইজুল ও মুশফিকের মধ্যে সপ্তম উইকেটে ৭২ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনারশিপ গড়ে ওঠে। তাইজুল ৫১ বলে ২২ রানের কার্যকরী ইনিংস খেলে মুশফিককে দারুণ সঙ্গ দেন। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদ ৬ এবং শরিফুল ইসলাম ১২ রান করলে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯০ রানে পৌঁছায়। পাকিস্তানের পক্ষে সর্বোচ্চ চারটি উইকেট নেন খুররম শাহজাদ। এছাড়া সাজিদ খান ৩টি এবং হাসান আলী নেন ২টি উইকেট।

 

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (তৃতীয় দিন শেষে)

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৭৮/১০ (লিটন ১২৬, মুমিনুল ৩০; সাজিদ খান ৪/৮৬)

পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ২৩২/১০ (বাবর আজম ৬৮; সাজিদ খান ৩৮; তাইজুল  নাহিদ রানা ৩/৬০, ৩/৬৭)

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৯০/১০ (মুশফিক ১৩৭, লিটন ৬৯, মাহমুদুল হাসান জয় ৫২; খুররম শাহজাদ ৪/৮৬, সাজিদ খান ৩/১২৬)

পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ০/০ (২ ওভার, লক্ষ্য ৪৩৭ রান)

অবস্থা: জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ৪৩৭ রান, বাংলাদেশের প্রয়োজন ১০ উইকেট।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন