আগামী মাসে উত্তর আমেরিকায় পর্দা উঠতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। আর এই মেগা টুর্নামেন্টে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে অন্যতম ‘ফেভারিট’ বা শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে গণ্য করছে ফুটবল বিশ্ব। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে এই 'ফেভারিট' তকমা নিয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন দলটির সাবেক তারকা খেলোয়াড় এবং কট্টর সমর্থকেরা। তাদের মতে, স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে ঘরের ফুটবল-পাগল কোটি মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ।
বার্সেলোনার সাবেক কিংবদন্তি এবং স্পেন
জাতীয় দলের রক্ষণভাগের প্রধান তারকা মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল নাদাল আল জাজিরাকে জানান, লা
রোখারা (স্পেন দল) নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা দল, তবে ট্রফি জিততে হলে তাদের ফ্রান্স,
ব্রাজিল ও জার্মানির মতো পরাশক্তিদের কঠিন চ্যালেঞ্জ পার করতে হবে।
নব্বইয়ের দশকে জোহান ক্রুইফের অধীনে বার্সেলোনার
বিখ্যাত 'ড্রিম টিম'-এ খেলা এই ডিফেন্ডার বলেন, "দলে পেদ্রি বা জোয়ান গার্সিয়ার
মতো দারুণ কিছু প্রতিভাবান তরুণ রয়েছে। তবে বিশ্বকাপ কোনো একক খেলোয়াড় জেতাতে পারে
না, এর জন্য প্রয়োজন পুরো স্কোয়াডের সংহতি ও ড্রেসিংরুমের দারুণ আবহ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হলো, খেলোয়াড়েরা যেন বাইরের প্রত্যাশার চাপ মাথায় না নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায়
রাখে।"
স্পেনের হয়ে ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ বিশ্বকাপে
অংশ নেওয়া নাদাল (টেনিস তারকা রাফায়েল নাদালের চাচা) আরও সতর্ক করে বলেন, এবার উত্তর
আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরম ও আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়াটাও খেলোয়াড়দের জন্য
বড় পরীক্ষা হবে। স্পেনের ফুটবলপ্রেমীরা অবশ্য এখনই নিজেদের ‘হবু চ্যাম্পিয়ন’ বলে চিৎকার করতে রাজি নন। কারণ, অতীতে
ফেভারিট তকমা নিয়ে ট্র্যাজেডির শিকার হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের।
বার্সেলোনাভিত্তিক স্প্যানিশ ফুটবল সমর্থক
গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মানেল হার্নান্দেজ (৩৭) বলেন, "২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের
কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। সেবার আমরা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং টানা দুবারের
ইউরো জয়ী হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিলাম। তাই খেলা
শুরুর আগেই চ্যাম্পিয়ন দাবি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কাগজে-কলমে আমাদের গ্রুপটি (সৌদি
আরব, উরুগুয়ে এবং কেপ ভার্দে) সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রতিটি দলই তাদের
সেরাটা উজাড় করে খেলে। সামান্য ভুল হলেই পরের রাউন্ডের সমীকরণ কঠিন হয়ে যাবে।"
তবে স্প্যানিশ জাতীয় দলের সাথে টেলিভিশন
প্রযোজক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া ব্রিটিশ সাংবাদিক গ্রাহাম হান্টার কিছুটা ভিন্নমত পোষণ
করেন। তাঁর মতে, স্পেনই বর্তমান বিশ্বের সেরা দল। তিনি বলেন, স্কোয়াডের সবাই ফিট থাকলে
ফর্মের বিচারে স্পেনের ধারেকাছে কেউ নেই। তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কেবল ফ্রান্স,
পর্তুগাল ও আর্জেন্টিনা রয়েছে। তবে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে শুধু সেরা দল হওয়াই
যথেষ্ট নয়, এখানে ভাগ্য, আবহাওয়া এবং খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থার মতো বিষয়গুলোও বড় ভূমিকা
রাখে।"
রয়টার্সের ফুটবল সংবাদদাতা ফার্নান্দো
কালাস স্পেনকেই এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দাবিদার মনে করেন। নিউইয়র্ক থেকে ব্রাজিলের
বিশ্বকাপ মিশন কভার করতে যাওয়া এই সাংবাদিক বলেন, "স্পেন কোনো একজন বা দুজন তারকার
ওপর নির্ভরশীল নয়, তারা পুরো দল মিলে একটি ‘ক্লাব’ বা ক্লাবের চেনা ছন্দের মতো খেলে।
এই দলের ৯০ শতাংশ খেলোয়াড় বয়সভিত্তিক দল থেকে তাদের কোচের অধীনে খেলছেন এবং পুরো সিস্টেমটা
খুব ভালো বোঝেন। গত ইউরোতেই তাদের ১১ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনাকে
কিছুটা ‘বুড়োদের দল’ এবং
ব্রাজিলের প্রধান তারকাদের ইনজুরি সমস্যার কারণে স্পেনকে তরুণ ও চনমনে দল হিসেবে এগিয়ে
রাখছেন কালাস।
তবে স্পেনের জন্য মূল চিন্তার কারণ হতে
পারে শীর্ষ তারকাদের চোটের তালিকা। বার্সেলোনার হয়ে মৌসুমের শেষ দিকে মাঠের বাইরে থাকা
১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল বিশ্বকাপে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু
গত মৌসুমে রদ্রির মারাত্মক ইনজুরি এবং সম্প্রতি নিকো উইলিয়ামসের নতুন চোট স্প্যানিশ
শিবিরে কিছুটা অস্বস্তি জিইয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে, ইউরোর পর বিশ্বকাপের এই ‘ডাবল’ মুকুট জয়ের মিশনে স্পেনের প্রধান
অস্ত্র হতে যাচ্ছে তাদের দলীয় সমন্বয়।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

