আঘাত-জর্জর ক্যারিয়ার ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টেনিসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ উইম্বলডনের ফাইনালে উঠলেন চেক প্রজাতন্ত্রের ক্যারোলিনা মুচোভা। লন্ডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাবের সেন্টার কোর্টে এক স্নায়ুক্ষয়ী ও রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে আমেরিকার টেনিস সেনসেশন কোকো গফকে টাইব্রেকার থ্রিলারে হারিয়েছেন তিনি।
এই জয়ের মাধ্যমে মুচোভা শুধু ক্যারিয়ারের
প্রথম উইম্বলডন ফাইনালেই পা রাখেননি, বরং স্বদেশি লিন্ডা নসকোভার সাথে একটি ঐতিহাসিক
‘অল-চেক’ ফাইনালও
নিশ্চিত করেছেন। টুর্নামেন্টের দশম বাছাই মুচোভা ম্যাচের তৃতীয় সেটের টাইব্রেকারে একটি
ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে সপ্তম বাছাই গফকে ৬-২, ১-৬, ৭-৬ (১২-১০) গেমে পরাজিত করেন। দুই
ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের এই মহাকাব্যিক লড়াই টেনিসপ্রেমীদের অনেক দিন মনে থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অস্ত্রোপচারের
মধ্য দিয়ে যাওয়া মুচোভার জন্য এই জয়টি ছিল রূপকথার মতো। ঘাসের কোর্টের প্রতি তীব্র
অ্যালার্জি থাকায় প্রতিবার ম্যাচ খেলার আগে তাঁকে প্রচুর ওষুধ, স্প্রে এবং চোখের ড্রপ
ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সেন্টার কোর্টের তপ্ত আবহাওয়াতেও তিনি নিজের একাগ্রতা হারাননি।
ম্যাচের একপর্যায়ে গফকে চমকে দিতে কোর্টে শরীর ছুঁড়ে এক অবিশ্বাস্য ‘ডাইভিং ভলি’ মারেন তিনি, যা ম্যাচের অন্যতম
সেরা মুহূর্ত ছিল। ম্যাচ শেষে কাঁপতে কাঁপতে মুচোভা বলেন, ফাইনালে ওঠা সত্যিই দারুণ
অনুভূতি। এটি একটি রোলারকোস্টার রাইডের মতো ছিল—কখনো উপরে, কখনো নিচে।
মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আপনি ম্যাচ
পয়েন্ট পাচ্ছেন, আবার পরের মুহূর্তেই ম্যাচ পয়েন্ট হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন! ভাবার কোনো
সময় ছিল না, ভীষণ স্নায়ুচাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথম সেটে মুচোভা ৬-২ ব্যবধানে
সহজেই জিতলেও, দ্বিতীয় সেটে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ান ২২ বছর বয়সী আমেরিকান তারকা
কোকো গফ। গফ ১-৬ ব্যবধানে সেটটি জিতে সমতা আনেন। তৃতীয় ও নির্ণায়ক সেটে দুই তারকার
ফোরহ্যান্ড ও ব্যাকহ্যান্ডের তুমুল লড়াই ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যায়।
টাইব্রেকারে মুচোভা প্রথমে ৪-১ এবং পরে
৬-৩ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েও গফের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সামনে ব্যাকফুটে চলে যান।
একপর্যায়ে গফ ৯-৮ ব্যবধানে ম্যাচ পয়েন্ট পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শত শত দর্শকের দীর্ঘশ্বাস
ফেলে গফ একটি সহজ ড্রপশট নেটে মেরে বসেন। সেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার মাশুল দিতে
হয় গফকে। পরের দুটি পয়েন্ট জিতে ম্যাচ ছিনিয়ে নেন ৩০ বছর বয়সী মুচোভা। ম্যাচ শেষে হতাশ
গফ বলেন, আমি খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। ম্যাচটি হজম করা কঠিন, তবে আমি কোর্টে
আমার সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলাম।
দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক কোকো গফ
ম্যাচ পয়েন্ট মিস করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিং বা কুৎসিত মন্তব্যের
আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অনলাইনে হয়তো এরই মধ্যে
আমাকে নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব জুয়াড়িরা বাজি ধরে হেরে
গেছে, তারা ক্ষোভ প্রকাশ করবে। এটা নিয়মিত ঘটনা, যা আমাকে আরও শক্তিশালী করবে। পরের
বার আমি যখন জিতব, তখন তাদের ট্যাগ করব। উল্লেখ্য, টেনিস তারকাদের এমন অনলাইন হয়রানি
বন্ধ করতে ২০২৪ সাল থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত 'থ্রেট ম্যাট্রিক্স' টুল ব্যবহার
করছে টেনিস সংস্থাগুলো।
দিনের অন্য সেমিফাইনালে ইউক্রেনের মার্তা
কস্ত্যুককে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছেন আরেক চেক তারকা লিন্ডা নসকোভা। এর ফলে গ্র্যান্ড
স্ল্যামের ইতিহাসে এই প্রথম দুই চেক নারী তারকা ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
একই সাথে এটি নিশ্চিত হলো যে, গত চার বছরের
মধ্যে তৃতীয়বারের মতো কোনো চেক নারী তারকার হাতে উঠতে যাচ্ছে উইম্বলডনের ঐতিহাসিক ‘ভেনাস রোজওয়াটার ডিশ’। এর আগে ২০২৩ সালে
মার্কেতা ভনদ্রোউসোভা এবং ২০২৪ সালে বারবোরা ক্রেচিকোভা উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।
আগামী শনিবার ফাইনালে মুখোমুখি হবেন মুচোভা ও নসকোভা।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

