Logo

প্রযুক্তি

পুরুষ ইঁদুরের রক্ত থেকে স্ত্রী ক্লোন তৈরি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:১০

পুরুষ ইঁদুরের রক্ত থেকে স্ত্রী ক্লোন তৈরি

ছবি: তাকাশি ইশিউচি

পুরুষ ইঁদুরের রক্তের কোষ থেকে নতুন প্রযুক্তির জেনেটিক টুলের সাহায্যে ওয়াই ক্রোমোজোম সফলভাবে অপসারণ করে স্ত্রী ক্লোন তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রজনন বিজ্ঞানের এ আবিষ্কার বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীদের রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞান ও গবেষণামূলক প্রকাশনা নিউ সায়েন্টিস্ট।

ক্রিসপার জেনেটিক টুলের সাহায্যে পুরুষ ইঁদুরের ভ্রূণ থেকে পুরুষ-নির্ধারক ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’ কেটে বাদ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ওয়াই ক্রোমোজোম চলে যাওয়ার পর সেই ভ্রূণটি আর পুরুষ থাকেনি, বরং পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ ও ডিম্বাণু উৎপাদনে সক্ষম স্ত্রী ইঁদুরে পরিণত হয়েছে।

যেহেতু এ স্ত্রী ইঁদুরটি তৈরিতে অন্য কোনো স্ত্রী প্রাণীর নিজস্ব জিন ব্যবহৃত হয়নি, কেবল মূল পুরুষ ইঁদুরটির কোষ ব্যবহৃত হয়েছে ফলে জন্ম নেওয়া স্ত্রী ইঁদুরটি জিনগতভাবে তার বাবারই ‘স্ত্রী ক্লোন’।

জাপানের ‘ইউনিভার্সিটি অব ইয়ামানাশি’র গবেষক তাকাশি ইশিউচি বলেন, ভেবেছিলাম নিষেকের পরপরই যদি ওয়াই ক্রোমোজোম সরিয়ে নেওয়া যায়, তবে লিঙ্গ পরিবর্তন সম্ভব, যা এক ধরনের ‘লিঙ্গ রূপান্তর’।

যেসব বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং যেখানে কেবল একটি পুরুষ বা কয়েকটি প্রাণী অবশিষ্ট রয়েছে এদের বংশরক্ষায় পদ্ধতিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।

যৌন প্রজননকারী প্রাণীদের ক্ষেত্রে পুরুষ বা স্ত্রী প্রাণীর সংকট দেখা দিলে পুরো প্রজাতির অস্তিত্বই বিলুপ্তির মুখে পড়ে। তবে কিছু প্রাণী অযৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, যেমন জেলিফিশ-জাতীয় ‘হাইড্রা’।

আবার টিকটিকি, কাঠি-পোকা বা হাঙ্গরের মতো প্রাণী ‘পার্থেনোজেনেসিস’ প্রক্রিয়ায় অনিষিক্ত ডিম্বাণু থেকেই নতুন প্রাণীর জন্ম দিতে পারে। এ উপায়ে জন্ম নেওয়া নতুন প্রাণীটি জন্মদাতার হুবহু ক্লোন ও একই লিঙ্গের হয়।

গবেষণাগারে তৈরি বিখ্যাত ‘ডলি’ ভেড়ার মতো বিভিন্ন ক্লোনও প্রায় একই ধরনের প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, ‘ওকিনাওয়া রাবল গোবি’র মতো কিছু রঙিন সামুদ্রিক মাছ প্রয়োজনভেদে নিজেদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে প্রজনন ধারা ধরে রাখতে পারে।

এসব মাছের প্রাকৃতিক সক্ষমতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইশিউচি ও তার সহকর্মীরা পুরুষ ক্লোন ভ্রূণের লিঙ্গ পরিবর্তনের এ উপায় উদ্ভাবন করেছেন, যাতে কাছাকাছি বংশগতির হওয়ার পরেও এদের মধ্যে প্রজনন সম্ভব হয়।

এর আগে, পুরুষ ইঁদুরের ক্লোন তৈরির কিছু চেষ্টার সময় দুর্ঘটনাবশত পুরুষ-নির্ধারক ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোমটি মুছে গিয়েছিল। ফলে ‘এক্সওয়াই’ জোড়ার বদলে কেবল একটি ‘এক্সও’ ক্রোমোজোম অবশিষ্ট থাকায় একটি স্ত্রী ইঁদুরের জন্ম হয়, যা বিজ্ঞানীদের এই নতুন গবেষণায় পথ দেখিয়েছে।

পুরুষ ইঁদুরের ভ্রূণ থেকে সফল ও নির্ভুলভাবে ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম অপসারণ করতে ‘ওয়াই-কাট’ নামের বিশেষ এক ক্রিসপারভিত্তিক টুল উদ্ভাবন করেছেন গবেষক ইশিউচি ও তার দল।

গবেষণায় প্রথমে এক পুরুষ ইঁদুরের রক্তকণিকা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে তা ডিম্বাণুতে বসানো হয়, যার নিজস্ব ডিএনএ আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

‘সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ নামের এ প্রক্রিয়ায় তৈরি কিছু ভ্রূণে ‘ওয়াই-কাট’ প্রয়োগের পর তা সারোগেট স্ত্রী ইঁদুরের দেহে বসানো হয়।

‘ওয়াই-কাট’ প্রয়োগ করা ভ্রূণ থেকে জন্ম নেওয়া সবকটি ইঁদুরই ছিল স্ত্রী ক্লোন, যেগুলো ওয়াই ক্রোমোজোম শূন্যতা ছাড়া জিনগতভাবে হুবহু তাদের বাবার মতো। যেসব ভ্রূণে ওয়াই-কাট প্রয়োগ হয়নি সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই পুরুষ ক্লোন হিসেবে জন্ম নিয়েছে।

জাপানের সুকুবার ‘রিকেন বায়োরিসোর্স রিসার্চ সেন্টার’-এর গবেষকদলের সদস্য শোগো মাতোবা এ প্রযুক্তিকে ‘ডুয়াল-সেক্স ক্লোনিং’ বা উভয় লিঙ্গের ক্লোনিং হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বাবা ইঁদুরটিকে তার ক্লোনগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি ছিল খুবই বিশেষ। এ অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ইশিউচি বলেন, সে তার নিজেরই একটি স্ত্রী সংস্করণ দেখতে পাচ্ছিল, যা দেখতে অনেকটাই কল্পবিজ্ঞান সিনেমার মতো।

গবেষণায় দেখা গেছে, জন্ম নেওয়া ক্লোনগুলো শতভাগ প্রজননক্ষম। নিজেদের মধ্যে প্রজননের পর এরা সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছে।

গবেষক মাতোবা বলেন, এর মানে একটিমাত্র পুরুষ জিনোম থেকেই সফলভাবে যৌন প্রজনন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। জন্ম নেওয়া এসব ইঁদুরছানা কোনো শারীরিক ত্রুটি ছাড়াই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে রয়েছে।

হিমায়িত টিস্যু বা ক্রায়ো-ব্যাংকে রক্ষিত নমুনা ব্যবহার করে এ প্রযুক্তির সাহায্যে বিলুপ্তপ্রায় বা বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষক ইশিউচি।

এর আগের একটি গবেষণায় পুরুষ ইঁদুরের ভ্রূণীয় স্টেম সেল লাইন থেকে পুরুষ ও স্ত্রী ক্লোন তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেই পদ্ধতিটি অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে কাজ করার সম্ভাবনা খুবই কম।

অন্যদিকে, ‘সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ পদ্ধতিটি এরইমধ্যে বহু স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে এবং তা জীবিত বা সংরক্ষিত যে কোনো দাতা নমুনা দিয়েই করা সম্ভব।

তবে এ প্রযুক্তির প্রধান বাধা হচ্ছে, একটি ‘এক্সও’ প্রজাতি হিসেবে স্ত্রী ইঁদুর সুস্থ ও প্রজননক্ষম হলেও অন্যান্য অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিড়িয়াখানা ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের জোট ‘এসইজেডএআরসি’-এর গবেষক লিন্ডা পেনফোল্ড বলেছেন, মানুষ বা ঘোড়ার ক্ষেত্রে ওয়াই ক্রোমোজোমবিহীন বা ‘এক্সও’ ক্রোমোজোমধারী সন্তান জন্মদানে সক্ষম হয় না। ফলে বন্যপ্রাণীদের বহু প্রজাতির ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

পাশাপাশি, এভাবে ওয়াই ক্রোমোজোম মুছে ফেলা প্রাণীর জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নৈতিক প্রশ্নও থেকে যায় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

গবেষক ইশিউচি এ সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বলেন, ‘রিভার্সিন’ নামের ওষুধের প্রয়োগে ‘এক্সও’ কোষগুলোকে দ্বিতীয় একটি ‘এক্স’ ক্রোমোজোম গ্রহণে বাধ্য করা সম্ভব– এমন প্রমাণ গবেষণায় রয়েছে। ফলে ‘ওয়াই-কাট’ প্রযুক্তির সঙ্গে এ ওষুধের সমন্বয় ঘটিয়ে অন্যান্য প্রজাতিতেও প্রজননক্ষম স্ত্রী প্রাণী তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

পেনফোল্ড সতর্ক করে বলেছেন, একটিমাত্র প্রাণীর ক্লোন থেকে বংশবৃদ্ধি করা হলে সেখানে জিনগত জটিলতা দেখা দেবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন